অরক্ষিত ১০৫৪ লেভেল ক্রসিং যেন মরণফাঁদ

রিমন রহমান: রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১ হাজার ৫৪টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নেই। এসব লেভেল ক্রসিং রীতিমতো মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অরক্ষিত বলে ট্রেন আসার সময় যখন তখন রেললাইনের ওপর উঠে পড়ছে বিভিন্ন যানবাহন। ঘটছে দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ।
সর্বশেষ গত রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর চামারপাড়া লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক পলিটেকনিক ছাত্র। তার নাম সারোয়ার জাহান প্রিন্স (২০)। নগরীর মতিহার থানার কাজলা এলাকায় তার বাড়ি। বাবার নাম আনোয়ারুল ইসলাম। নিহত সারোয়ার চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বেসরকারি পলিটেকনিকে পড়াশোনা করতেন। ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে একটি লোকাল ট্রেন আসছিল। তখন সারোয়ার মোটরসাইকেল চালিয়ে চামারপাড়া লেভেল ক্রসিংয়ে উঠছিলেন। স্থানীয়রা তখন ‘ট্রেন আসছে’ ‘ট্রেন আসছে’ বলে চিৎকার দেন। সারোয়ার মোটরসাইকেলের হ্ইাড্রোলিক ব্রেক কষেন। এতে তিনি বাইক নিয়ে রেললাইনে পড়ে যান। কিন্তু উঠে সরে যাওয়ার আগেই ট্রেন চলে আসে। ট্রেনটি সারোয়ার ও তার মোটরসাইকেলকে প্রায় ১৫০ গজ দুরে দাশপুকুর মোড় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। এতে ট্রেনের চাকায় সারোয়ারের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে রেলওয়ে এবং থানা পুলিশ গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
গতকাল সোমবার সকালে ওই এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়। তারা জানান, রাজশাহী শহরের ভেতর দিয়ে রেললাইন গেছে। কিন্তু এলাকার বেশিরভাগ লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নেই। ডিঙ্গাডোবা মোড়ের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের পাশেই পারভেজ আলীর খাবারের হোটেল। পারভেজ বলেন, এখানে কোনো গেটম্যান নেই। আগে আশপাশের দোকানিরা ট্রেন আসার সময় বাঁশ দিয়ে পথ আটকাতেন। কিন্তু কিছু দিন আগে দোকানগুলোকে উচ্ছেদ করে রেল কর্তৃপক্ষ। দোকানগুলো বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে। এখন কেউ আর পথ আটকায় না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
পাশেই অরক্ষিত দাশপুকুর মোড়ের লেভেল ক্রসিং। এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে তার মামাতো বোন মেরিনা খাতুনের প্রাণ গেছে। মেরিনার চাচা রুস্তম আলীও প্রাণ হারিয়েছেন এই লেভেল ক্রসিংয়ে। গত কয়েকমাসের মধ্যে তাদের এলাকায় চারজন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেলেন। ফজলুর রহমান নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, ইদানিং ট্রেনের চালকরা হর্ণও দেন না। ফলে অরক্ষিত রেললাইনে উঠে যান অনেকেই। অনেক সময় পেছন থেকে গিয়ে মানুষকে টেনে ধরতে হয়।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা অঞ্চলে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৩৪টি। এর মধ্যে ৭১৫টিই চলছে গেটম্যান ছাড়া। আর ৩৩৯টি লেভেল ক্রসিংয়ের কোনো বৈধতায় নেই। এই ১ হাজার ৫৪টি লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
এমন একটি লেভেল ক্রসিংয়ে গত বছরে ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় বর-কনেসহ মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হন। অরক্ষিত ক্রসিংয়ে বিয়ের গাড়িটিকে রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ‘পদ্মা এক্সপ্রেস’ ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে। এমন বড় ঘটনাগুলো নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হলেও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ছোট দুর্ঘটনার কোনো খোঁজই রাখে না কেউ।
রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, রেললাইনের পাশে নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের কারণে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে হলে রেলওয়ের অনুমোদন নেয়ার বিধান থাকলেও সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদ সেই অনুমোদনের তোয়াক্কা করে না। যেখানে প্রয়োজন, সেখান দিয়েই তৈরি করা হয় রাস্তা। এ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা করেও ফল পাওয়া যায় না। তাই বৈধতা না থাকা ৩৩৯টি লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে কোনো সতর্ক বার্তাও নেই। তবে অনুমোদন থাকা অরক্ষিত ৭১৫টির সামনে সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছে। তারপরেও দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছেই।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, পশ্চিমাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং ও গেটগুলোর পুনর্বাসন ও মান উন্নয়নে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে একটি প্রকল্প শুরু হয়েছে এবং তা শেষ হবে ২০২০ সালের জুনে। এ প্রকল্পে অন্তত অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংগুলো সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে। সেই সাথে অবৈধ এবং গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিংগুলোকেও সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। ২০১৫ থেকে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় এসেছে ৩২৬টি ক্রসিং। অনুমোদন পেয়েছে ৫৩টি অবৈধ ক্রসিং। এছাড়া ২০৪টি ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাজ চলমান রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মিহির কান্তি গুহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। তবে লেভেল ক্রসিং ও গেটগুলোর পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন প্রকল্পে অনেক জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদেরই বেতন-ভাতার সমস্যা হচ্ছে। তাই বেতন ভাতা এবং প্রয়োজনীয় আরও জনবল নিয়োগের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। খুব দ্রæতই এটা অনুমোদন হয়ে যাবে। তখন আরও জনবল নিয়োগ করা যাবে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা করি।

শর্টলিংকঃ