অগ্নিঝরা মার্চ

সোনালী ডেস্ক: আজ অগ্নিঝরা মার্চের ১১তম দিন। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ চতুর্থ দিবস। সারাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাত্মক অসহযোগ পালন করে। গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে।
বাঙালি নিজেদের উজাড় করে দিয়ে উদয়াস্ত এ কাজেই নিয়োজিত থাকে। কোন গণশত্র্ব বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃঙ্খল পরিসি’তির সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন গ্র্বপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুর্ব করে। এতে শান্তি-শৃঙ্খলার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে দেয়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক যে সব যানবাহন চলার কথা সেগুলো চলাচল শুর্ব করে; যে সব বেসরকারি অফিস খোলা থাকার কথা সে সব খোলা থাকে। যথারীতি সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলে এবং সর্বত্র যা দৃশ্যমান হয় সেটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধিকারের দাবিতে অটল-অবিচল সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অৰরে অৰরে পালন করে যাচ্ছে। হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মচারী তাদের সংশিৱষ্ট বিভাগের অফিস বর্জন করেছেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো, অসহযোগ সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস’া, পেশাজীবীগণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে মানুষের মনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অবিচল সংগ্রামী মনোভাব বিরাজ করতে থাকে।
এদিন বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সকল রাজনৈতিক পৰকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন কর্বন।’ অপরদিকে জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান সামরিক সরকারের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, এক রাষ্ট্রের জোয়ালে আবদ্ধ না থাকলেও দুটি স্বাধীন ভ্রাতৃরাষ্ট্র হিসেবে আমরা পরস্পরের এবং বিশ্বের এই অংশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারব। ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বিদ্যমান পরিসি’তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব খুরশীদ হক বঙ্গবন্ধুর সাথে তার বাসভবনে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি আগের দিন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। এদিন পশ্চিম পাকিস্তানের কাম্বেলপুর হতে নির্বাচিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক পরিসি’তির সঙ্কট উত্তরণের উপায় এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ দৌলতানার একটি পত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে হস্তান্তর করেন। এদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বাসভবনে সাৰাত করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে যতদিন খুশি বাংলাদেশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশে গণহত্যা চালানোর পাঁয়তারা করছে।’ এ অবস’ায় মানবতা রৰায় তাদের দেশ না ছাড়তে অনুরোধ করেন।
এদিকে, সদ্য ঢাকা ত্যাগকারী এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচী প্রত্যাবর্তন করে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কুর্মিটোলার ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনের সচিব ও কর্মকর্তাগণ শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছে। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেব প্রদত্ত শর্তসমূহ মেনে অবিলম্বে ৰমতা হস্তান্তর করা।’ সমগ্র পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুর পৰে সমর্থনসূচক ইতিবাচক পদৰেপ নিলেও জনাব ভুট্টো এবং ইয়াহিয়ার কিছু বশংবদ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন না করে আপস-সমঝোতার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিতে থাকে। এমতাবস’ায় আজ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান ঢাকায় আগমন করেন।
এদিন হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগের কর্মচারীরা তাদের সংশিৱষ্ট অফিস-আদালত বর্জন অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী স্টেট ব্যাংক, বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক, ট্রেজারি অফিসে লেনদেন চলে। স্বাভাবিকভাবেই রেল ও বিমান চলাচল করে। অভ্যন্তরীণ ডাক, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। রাজধানীর বিপণি কেন্দ্র ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। স্বাধিকার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এদিনও প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সকল অফিস এবং বাড়িতে-গাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলিত থাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী সিনেমা হলগুলোর মালিকগণ প্রমোদকর ব্যতীত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। বরিশালে এদিন কারাগার ভেঙে ২৪ কয়েদি পালিয়ে যায় এবং পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। কুমিলৱাতেও অনুরূপ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।
বিগত কয়েক দিনের ন্যায় আজও বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ নিহত ও আহতদের সাহায্যার্থে গঠিত সাহায্য তহবিলে উদারহস্তে অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃ চতুষ্টয় এক বিবৃতিতে সামরিক সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব, উপাধি বর্জনের আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীর চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সহযোগিতা না করার অনুরোধ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ছাত্রনেতৃবৃন্দ শর্তারোপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ইয়াহিয়া প্রদত্ত ৬ মার্চের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে প্রতিদিন একের পর এক নির্দেশ জারি অব্যাহত রাখেন। জনসাধারণের নামে বঙ্গবন্ধুর পৰে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের স্বাৰরিত নয়া নির্দেশ জারি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের আন্দোলন নজিরবিহীন তীব্রতা লাভ করেছে। বাংলাদেশে জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সব নির্দেশ প্রদান করেছেন প্রতিটি লোক আপন স’ানে থেকে পবিত্র দায়িত্ব জ্ঞানে তার সবগুলো কার্যকর করেছে বলেই অসহযোগ আন্দোলন এরূপ সর্বাত্মক হয়ে উঠেছে। জীবনের প্রতিটি স্তরের লোকজনের এই উচ্চ দায়িত্ববোধ সকলের জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস। এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ হারে উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং আমাদের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণভাবে চালু রাখার জন্যও আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার এবং আমাদের বুভুৰু জনসাধারণকে দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত করার কায়েমী স্বার্থবাদী এবং গণবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনসাধারণ উৎপাদনের প্রতিটি ৰেত্রে তাদের সকল শক্তি নিয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা কঠোর কৃচ্ছতা পালনেও প্রস্তুত। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য অর্থনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত সকল লোক প্রতিটি ৰেত্রে অবশ্যই সুকঠোর শৃঙ্খলা পালন করবে। এসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে এদিন থেকে কিছু বিষয় হরতালের আওতামুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। যেমন-ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক যে সব ৰেত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো সাপেৰে ছুটির দিনসহ নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। মজুরি ও বেতন পরিশোধের ৰেত্রে শ্রমিক সংস’ার প্রতিনিধিদের সার্টিফায়েড পে-বিলের মাধ্যমে তা করতে হবে। এছাড়াও কৃষি তৎপরতা, বন্দর পরিচালনা, ইপিআইডিসি ফ্যাক্টরি পরিচালনা, সাহায্য, পুনর্বাসন ও পলৱী উন্নয়ন কাজ, প্রাইমারী স্কুল শিৰকদের বেতন পরিশোধ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে এজি অফিস আংশিক সময় খোলা রাখা, কারাগারের ওয়ার্ড অফিস খোলা রাখা, আনসারদের দায়িত্ব পালন, বিদ্যুত ও পানি সরবরাহ চালু রাখতে সংশিৱষ্ট দপ্তর খোলা রাখাসহ সকল ইন্স্যুরেন্স অফিস খোলার রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এছাড়াও তাজউদ্দীন আহমেদ চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য সামগ্রিক অর্থনৈতিক ৰেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা রৰার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক বিষয়াবলির জন্য নির্ধারিত টিম সদস্যদের পরামর্শক্রমেই এ ব্যবস’াদি অবলম্বিত হয়।

শর্টলিংকঃ