অগ্নিঝরা মার্চ

সোনালী ডেস্ক: আজ অগ্নিঝরা মার্চের ৯ম দিবস। ১৯৭১-এর এদিন পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে বলেন, শেখ মুজিব নির্দেশিত মার্চের মধ্যে কিছু না হলে আমি শেখ মুজিবের সাথে মিলে ১৯৫২ সালের ন্যায় আন্দোলন শুরু করব। তিনি বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, অনেক হয়েছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। ‘লা-কুম দ্বী-নুকুম, ওয়ালিয়া দ্বীন’ (অর্থাৎ তোমার ধর্ম তোমার আমার ধর্ম আমার)। পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানীর এই বক্তব্যের পর বঙ্গবন্ধু মুজিবের সঙ্গে পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে তাদের দীর্ঘ টেলিফোন আলাপ হয়।
এদিকে শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের বৈঠকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। সভায় কয়েকদিনের আন্দোলনে নিহতদের, বিশেষ করে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক ইকবালসহ অন্যদের স্মরণে এক শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে সারাদেশ ছিল অচল। সরকারি-আধা সরকারি স্বায়ত্ত¡শাসিত অফিস, আদালতের কর্মীরা হরতাল পালন করেন। যেসব অফিস জরুরি প্রয়োজনে খোলা রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল সেসব অফিস নির্দেশনানুযায়ী খোলা ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক সরকারি, বেসরকারি, বাসাবাড়িতে কালো পতাকা উড্ডীন ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের নির্দেশে ব্যাংক-বীমা দফতরসমূহ সকাল সাড়ে ৯টা হতে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা ছিল এবং এ সময়ে কড়া নজরদারি ছিল যাতে কোন টাকা-পয়সা পশ্চিম পাকিস্তানে চালান হতে না পারে।
বরাবরের মতো প্রতিদিন সকাল হলেই আমরা ৩২ নম্বরে চলে যেতাম এবং নেতার নির্দেশ মোতাবেক দায়িত্ব বুঝে নিয়ে যে যার কাজে বেরিয়ে পড়তাম। অসহযোগ আন্দোলনের সার্বিক কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পুরো ঢাকা শহরে ছুটে বেড়াতে হতো। সেই সময়ে নির্বিঘেœ এসব কাজ সম্পাদনের জন্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম আমাকে একটি গাড়ি দিয়েছিলেন। সেই গাড়িতে করে উল্কার মতো ছুটে বেড়াতে হয়েছে শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত। গাড়ির পেছনে একটা ব্যাগ থাকত। সময়টাই এমন ছিল যে, কখন কোথায় কী অবস্থায় পড়তে হয় তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওরা প্রস্তুত হচ্ছে। আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওদের সময়ের প্রয়োজন। আমাদেরও সময়ের প্রয়োজন। যে কোন সময় যে কোন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু এদিন বলেছিলেন, এখন অনেক খেলা হবে। অনেক ষড়যন্ত্র চলবে। আমাদের প্রত্যেককে সজাগ থাকতে হবে এবং যে কোন মূল্যে আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। ষড়যন্ত্রের খেলা শুরু হয়েছিল সেটা সুস্পষ্ট হয়েছে গতকাল। সামরিক বিধি পরিবর্তন করে আসন্ন গণহত্যা সংঘটনে বেলুচিস্তানের কসাইখ্যাত টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিয়োগ করা হয়। সরকারি মাধ্যম থেকে একদিকে প্রচার করা হচ্ছে সমস্যা সমাধানে অচিরেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা সফরে আসছেন। অপরদিকে বাঙালি নিধনে কসাই নিয়োগ করা হচ্ছে। রাজশাহীতে অকারণেই সান্ধ্য আইন জারী করে শান্তিপ্রিয় জনসাধারণকে উস্কানির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
অসহযোগ আন্দোলনে নিহত-আহতদের পরিবারকে সাহায্যের জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিদিন অর্থ-খাদ্য-রক্ত সাহায্য দিতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিস এবং মেডিক্যাল কলেজসমূহের সামনে লাইন দিচ্ছে। ততদিনে ঢাকা শহরসহ দেশের প্রায় ৬০-৭০টি স্থানে গোপন এবং প্রকাশ্য সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মূল কাজ ছিল ছাত্র-যুবকদের সশস্ত্র ট্রেনিং দেয়া। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ছাত্র-যুবকদের স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার জন্য কমিটি করতে সহায়তা করা। সে সময় এসব কাজে ছাত্রলীগের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই বলেছিলেন, কোনরূপ উস্কানির মুখেও হঠকারিতা নয়; আমাদের অসহযোগ কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। ওদের উস্কানিমূলক কোন ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেয়া চলবে না। নেতার নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারাদেশে প্রতিদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে উঠতে থাকল এবং আমরাও এগিয়ে যেতে থাকলাম স্বাধীনতার মাহেন্দ্রক্ষণটির দিকে।

শর্টলিংকঃ