নারীদের মন জয়ে মাঠে আ’লীগ

14/07/2018 1:10 am0 commentsViews: 47

রিমন রহমান: রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) এবারের নির্বাচনেও বড় ফ্যাক্টর হতে পারে নারী ভোটার। কারণ, রাজশাহী মহানগরীতে পুর্বষের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যাই বেশি। গত সিটি নির্বাচনে নারীদের ভোট কম পাওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পরাজয় হয়েছিল বলে মনে করে দলটি। তাই এবার নারীদের মন জয় করে তাদের ভোট আদায়ে কাজ করছে আওয়ামী লীগ।
২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে নগরীর বাসা-বাড়িতে প্রথমবারের মতো গ্যাস সংযোগ দেওয়া শুর্ব হয়েছিল। কিন্তু এতেও ৰমতাসীন দলের প্রতি আকৃষ্ট করা যায়নি নারীদের। সেই নির্বাচনে মহানগর বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জয়ী হন। পরাজিত হন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন।
এই পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, ভোটগ্রহণের কয়েকদিন আগে বহিরাগত কয়েক হাজার নারী এনে শহরে প্রচারণায় নামায় জামায়াত। তারা নগরীর প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে হেফাজতে ইসলামের ৫ মে’র ঘটনা নিয়ে নারীদের মাঝে অপপ্রচার চালায়। এতে বিভ্রান্তিতে পড়ে আওয়ামী লীগের প্রতি ৰুব্ধ হন নারীরা। ফলে ভোট পড়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর প্রতীকে। পরাজিত হন জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহিদ এএইচএম কামার্বজ্জামানের ছেলে এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন।
এবারের নির্বাচনেও বিএনপির বির্বদ্ধে নারীদের মাঝে অপপ্রচারের অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পৰ থেকে নির্বাচন কমিশনে লিখিতভাবেই এ অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাড়া-মহলৱা ও বস্তিতে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকরা নারীদের বলছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হলে বস্তি উচ্ছেদ করে উন্নয়ন কাজ করা হবে। তাদের বসতবাড়ি ভেঙে বিনোদনকেন্দ্র করা হবে। এভাবে অপপ্রচার চালিয়ে ধানের শীষের প্রতীকের প্রতি নারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি বলেন, কোথাও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে না। উল্টো তার অভিযোগ, নৌকার সমর্থকরা তাদের কর্মীদের প্রচার চালাতেই দিচ্ছে না। তাই অপপ্রচারের প্রশ্নই ওঠে না।
এদিকে এবার কাউকে কোনো অপপ্রচার চালাতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন। তিনি বলেন, ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের সময় নারীদের মাঝে আওয়ামী লীগের বির্বদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। জামায়াত-বিএনপির নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট নষ্ট করে। এবার আমাদের বাড়িতে এসে মিথ্যা বলে ভোট নষ্ট করবে, এমনটি করতে দেয়া হবে না।
নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের মোট ভোটার ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জনই নারী। পুর্বষ ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে নারীদের ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে একমাত্র রাজশাহী বিবি হিন্দু অ্যাকাডেমি কেন্দ্রে জয় পান লিটন। সেখানে তিনি পান ৬২৪ ভোট। আর বুলবুল পান ৫০৭ ভোট। এর বাইরে অধিকাংশ নারী কেন্দ্রে লিটনের চেয়ে বেশি ভোট পান বুলবুল।
লিটন সবচেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন নারী ভোটকেন্দ্র নগরীর ডাঁশমারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে বুলবুলের ২ হাজার ২৯ ভোটের বিপরীতে লিটন পান মাত্র ৪৮৩ ভোট। নগরীর মোট ১৩৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটগ্রহণ হয় এই কেন্দ্রে। এছাড়া নগরীর অন্য নারী ভোটকেন্দ্রগুলোতেও বুলবুলের চেয়ে ভোট কম পান লিটন। তাই এবার নারীদের ব্যাপারে বেশ সাবধান লিটন ও তার কর্মী-সমর্থকরা। অবশ্য এবার নারীদেরও ভাবনায় এসেছে নৌকা। গত সিটি নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে গ্যাস এলেও নিজ বাড়িতে গ্যাস না পাওয়ায় তারা এবার লিটনকেই মেয়র হিসেবে চাইছেন। তারা মনে করছেন, লিটন মেয়র হলে তারা বাড়িতে গ্যাস পাবেন। অবশ্য আওয়ামী লীগও নির্বাচনি প্রচারণায় এমন প্রতিশ্র্বতি দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কার্যক্রম খায়র্বজ্জামান লিটন মেয়র হলে চালু করবেন বলে ভোটারদের বলা হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারাও। তারা বলছেন, নারীদের একটি বড় অংশ গৃহিণী। ফলে তাদের টানতে নির্বাচনি প্রচারণায় গ্যাসের বিষয়টি আসছে। আর রাজশাহীতে গ্যাস আনা লিটনেরই অবদান। এনিয়ে নগরজুড়ে প্রচারপত্রও সাঁটিয়েছেন কর্মী-সমর্থকরা। এসব প্রচারপত্রে লেখা- ‘গ্যাস এনেছে লিটন ভাই, মা-বোনের সমর্থন চাই।’ নারী ভোটার টানতেই এই শেৱাগান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মেয়র এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন বলেন, ‘যেসব বাড়িতে গ্যাসের লাইন দেয়া হয়েছে কিন্তু সংযোগ দেয়া হয়নি, সেসব বাড়িতে আমি মেয়র হলে দ্র্বত গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করব। আরও নারীবান্ধব নানা কর্মসূচি থাকবে পরিকল্পনায়। আমার মা-বোনেরা অপপ্রচারে বিশ্বাস করে গতবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। আমি মনে করি, উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা তাদের ভুল বুঝেছেন। এবার তারা আমাকে ভোট দেবেন।’
এদিকে খায়র্বজ্জামান লিটনের এবারের নির্বাচনি ইশতেহারেও নারীদের বিষয়টি গুর্বত্ব দেওয়া হয়েছে। লিটন তার ইশতেহারে বলেছেন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নারী উদ্যোক্তাদের আইটিভিত্তিক উদ্যোগ, কুটির শিল্প ও হস্তশিল্প স্থাপন এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহায়তা প্রদান করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের জন্য আলাদা মার্কেট নির্মাণ করা হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ওয়ার্ডভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে উন্নয়নের স্বার্থে গতকাল বিকালে লিটনকে ভোট দেয়ার প্রতিশ্র্বতি দিয়েছেন নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিপুলসংখ্যক নারী। শিরোইল কলোনী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তারা দুই হাত তুলে ধরে এ প্রতিশ্র্বতি দেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যের শেষের দিকে খায়র্বজ্জামান লিটন উপস্থিত নারীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি রাজশাহীর উন্নয়ন চান? রাজশাহীর উন্নয়নে নৌকা মার্কায় ভোট দিবেন? এ সময় উপস্থিত প্রায় দেড় হাজার নারী-পুর্বষ দুই হাত তুলে খায়র্বজ্জামান লিটনকে ভোট প্রদানের প্রতিশ্র্বতি দেন।
এ সময় ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেনা বেগম বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে কোনো উন্নয়ন কাজ চোখে পড়েনি। রাস্তাঘাটের খুব খারাপ অবস্থা। যে মেয়র কোনো উন্নয়ন করতে পারেন না, তাকে কেউ ভোট দেবে না। রাজশাহীর উন্নয়নে লিটন ভাইয়ের বিকল্প নেই। তাই আমরা লিটন ভাইকে ভোট দিব।’
আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই নির্বাচনে নারীদের মন জয় করতে তারা আলাদাভাবে কাজ করছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই চলছে এই কার্যক্রম। এখন প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও নারীদের নিয়ে উঠান বৈঠক করছেন লিটনপত্নী শাহীন আক্তার রেণী। মহানগর যুব মহিলা লীগ ও ছাত্রলীগের নারী কর্মীরাও ছুটে যাচ্ছেন পাড়া-মহলৱায়। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে তারা এই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন চাইছেন।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, রাজশাহী সিটিতে পুর্বষ ভোটারের চেয়ে ছয় হাজারের বেশি নারী ভোটার। তারা প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হতে পারেন। তাই অনেক দিন ধরেই নারী ভোটারদের দাবি-দাওয়াকে গুর্বত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ বাড়ি থেকেই নারীদের উদ্বুদ্ধ করছেন। আমিও প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমার মা আর স্ত্রীকে বলি- ‘ভোটটা কিন্তু নৌকা প্রতীকে দিও’।

Leave a Reply