আস্‌-সালাম স্বাগতম মাহে রমজান

18/05/2018 1:06 am0 commentsViews: 8

মোহাম্মদ মাকছুদ উলৱাহ: বছর ঘুরে আবার এলো মাহে রমজান। রহমত, বরকত আর মাগফিরাতের বাহন হয়ে এলো মাহে রমজান। মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান আলৱাহর একটি বিশেষ উপহার এই রমজান মাস। তাই সুদীর্ঘ অতীত থেকে মুসলিম জাতি অত্যন্ত গুর্বত্ব ও মর্যাদার সাথে মাহে রমজানকে উদযাপন করে আসছে। এই রমজান মাসেই ইসলামের নবী, শেষনবী, শ্রেষ্ঠনবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.) রিসালাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই রমজান মাসেই ইসলামের সাংবিধানিক গ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল হয়েছিল। শুধু আল-কোরআনই নয় পূর্ববর্তী সব আসমানী গ্রন্থও রমজান মাসেই অবতীর্ণ হয়েছিল। হজরত ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন রাসুলুলৱাহ (সা.) বলেছেন, হজরত ইবরাহীম (আ.) এর সহীফাসমূহ রমজান মাসের প্রথম দিনে নাজিল হয়েছিল, তাওরাত নাজিল হয়েছিল রমজান মাসের ষষ্ঠদিনে আর ইনঞ্জিল অবতীর্ণ হয়েছিল মাহে রমজানের তেরতম দিনে এবং মহাগ্রন্থ আল কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে একযোগে নাজিল হয়েছিল রমজান মাসের চব্বিশতম দিনে।(মুসনাদে আহমাদ, খন্ড: ২৮, পৃষ্ঠা: ১৯১, হাদীস: ১৬৯৮৪, আল-মুজামুল কাবির, খন্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ৭৫, হাদীস: ১৮৫, শুআবুল ঈমান, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৫২১, হাদীস: ২০৫৩) হজরত জাবের (রা.) বর্ণিত এক হাদীস থেকে জানা যায়, জাবুর কিতাবটি নাজিল হয়েছিল, মাহে রমজানের বার তারিখে আর ইঞ্জিল নাজিল হয়েছিল, রমজান মাসের আঠার তারিখে।(তাফসিরে ইবনে কাসির, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৬৮) আসমানী কিতাবসমূহের কোন কোনটা নাজিলের তারিখ সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ পাওয়া গেলেও সেগুলি যে রমজান মাসে নাযিল হয়েছিল এবিষয়ে সবার ঐক্যমত পাওয়া যায়। আর রাসুলুলৱাহ (সা.) এর উপর সর্ব প্রথম ওহী তথা আল-কোরআন নাযিল হয়েছিল শবে কদরে অর্থাৎ মাহে রমজানের সাতাস তারিখে এবিষয়ে কারো কোন দ্বিমত নাই। সুতরাং রমজান হল আসমানী কিতাব নাজিলের মাস, রমজান হল নবুওয়াত ও রিসালাতের মাস।
মাহে রমজান মহান আলৱাহ শুধু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে নির্বাচিত করে তাদেরকে নবুওয়াত ও রিসালাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন তাই নয়, আলৱাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর তাবৎ সাধারণ মুমিন মুসলমানের জন্যে এ মাসে রেখেছেন প্রাপ্তি ও মর্যাদার মহান সুযোগ। মহান রবের সীমাহীন কর্বণা আর নেকি হাসিলের সুযোগ নিয়ে হাজির হয় মাহে রমজান। কোন মুমিন যাতে এই মহান সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে না যায় সে জন্যে দয়াময় আলৱাহর পৰ থেকে প্রতিনিয়ত তাদেরকে আহবান জানান হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন রাসুলুলৱাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাত আসে তখন শয়তান ও দুষ্টু প্রকৃতির জিনদেরকে আটক করে ফেলা হয়। আর জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় অতঃপর এ মাসের মধ্যে তার একটি দরজাও আর খোলা হয়না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় অতঃপর তার একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয়না। আর আলৱাহর পৰ থেকে একজন ঘোষক অনবরত ঘোষণা করতে থাকে, হে সৎকর্মপরায়ন ! তুমি দ্র্বত অগ্রসর হও। আর হে পাপাচারি ! তুমি নিবৃত হও। আর আলৱাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে থাকেন। আর এভাবে রমজান মাসের প্রত্যেক রাতে মহান আলৱাহ জাহান্নামীদেরকে মুক্তি দান করেন।( মুসনাদে আহমাদ, খন্ড: ৮, পৃষ্ঠা:৩৮৮, হাদীস: ৮৬৭০, ইবনে মাযা, হাদীস: ১৬৪২ , তিরমিযী, হাদীস: ৬৮২ , সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ১৮৮৩, সহীহ ইবনে খুজাইমা, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৮৮, হাদীস: ১৮৮৩, আল মুসতাদরেক আলাস সহিহাইন, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৮২, হাদীস: ১৫৩২, আস-সুনানুস সাগীর, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১১৩, হাদীস: ১৩৫৯)
রমজান মাসে মহান আলৱাহ অসীম রহমতের দ্বার সম্পূর্ণ উমুক্ত করে দেন। তারপরেও যদি কোন মুমিন মহান মওলার রহমত হাসিল করতে ব্যর্থ হয় তাহলে, এটা তার চরম দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন রাসুলুলৱাহ (সা.) স্বীয় সাহাবীদেরকে শুভসংবাদ দিতে গিয়ে বলেছেন, তোমাদের নিকট রমজান মাস আগমন করেছে, এটি একটি বরকতপূর্ণ মাস। এমাসে রোজা রাখা মহান আলৱাহ ফরজ করেছেন। এমাসে জান্নাতের দরওয়াজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় ও এতে শয়তানকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। এমাসে আছে কদরের রাত, যা এক হাজার মাস অপেৰা উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে সে যেন সবকিছুই হারাল।(মুসান্নেফে ইবনে আবি শাইবা, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৭০, হাদীস: ৮৮৬৭, মুসনাদে আহমাদ, খন্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৫৯, হাদীস: ৭১৪৮, সুনানে নাসাঈ, খন্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১২৯, হাদীস: ২১০৬, আস-সুনানুল কুবরা, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯৬, হাদীস: ২৪২৭, শুআবুল ঈমান, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১৮, হাদীস: ৩৩২৮)
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মহা মূল্যবান। কারণ পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব নেয়া হবে কিয়ামতের দিন। আর সে হিসাবের উপর ভিত্তি করেই চিরস্থায়ী ঠিকানা নির্ধারিত হবে। অথচ আমাদের জীবনটা সুনির্দিষ্ট কিন্তু অজ্ঞাত। অজ্ঞাত জীবন পরিক্রমায় নিজের আমলনামাকে যারা নেকি দিয়ে ভরে নিতে পারবে, কেবল তারাই কিয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং জান্নাতের অধিকারী হবে। পৰন্তরে যাদের আমলনামায় পাপের পরিমাণ বেশি হবে তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এরশাদ হয়েছে, আর কিয়ামতের দিনের আমল পরিমাপের বিষয়টি নিরেট সত্য। সুতরাং যাদের নেক আমলের পালৱা ভারি হবে, তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের নেক আমলের পালৱা হাল্কা হবে, তারা হল ওই সমস্ত লোক যারা নিজেদের ৰতি করেছে। তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত।(সুরা আল-আরাফ: ৮-৯) আরো এরশাদ হয়েছে, অতঃপর যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। ফলত যাদের নেক আমলের পালৱা ভারি হবে, তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের নেক আমলের পালৱা হালকা হবে, তারা হলো ওই সমস্ত লোক যারা নিজেদের ৰতি সাধন করেছে, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। আগুন তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা সেখানে বিভৎস আকৃতি ধারণ করবে।(সুরা আল-মুমিনুন: ১০২-১০৪) জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচবার আহবান নিয়ে এল মাহে রমজান, আমলের পালৱাকে নেকি দিয়ে পূর্ণ করবার সুযোগ নিয়ে এল মাহে রমজান, সমগ্র পৃথিবীর মহান স্রষ্টা, মহান আলৱাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ এনে দিল মাহে রমজান, বছর ঘুরে আবার আসা মাহে রমজানকে তাই আমরা জানাচ্ছি মোবারকবাদ! আস্‌-সালাম স্বাগতম, মাহে রমজান। সেই সাথে দৈনিক সোনালী সংবাদের অগণিত পাঠক ও শুভানুদ্ধায়িকে জানাচ্ছি শুভেচ্ছা। আলৱাহ রাব্বুল আলামীন সকলকে পবিত্র মাহে রমজানের পবিত্রতা রৰা করার এবং মন-প্রাণ উজাড় করে নেক আমল করার তাওফিক দান কর্বন।

Leave a Reply