আ’লীগে ভোটের হাওয়া

18/05/2018 1:10 am0 commentsViews: 44

রিমন রহমান: দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থিতা নিয়ে ৰমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রবল, কিন্তু উল্টো চিত্র রাজশাহীতে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার জন্য এই নগরের নেতাদের মধ্যে নেই কোনো প্রতিযোগিতা। তাই সৃষ্টি হয়নি কোনো বিরোধও। ফলে সবাই মিলে একযোগে নেমেছেন নির্বাচনের মাঠে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নাম আগেই ঘোষণা হয়েছে। তিনি হলেন সাবেক মেয়র এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন। লিটন এখন ভোটের প্রস্তুতিতে পুরোপুরি ব্যস্ত। তাকে প্রার্থী মেনেই কাজ করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। খুলনা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয়ের পর তারা আরও উজ্জ্বীবিত হয়ে ওঠায় মহানগর আওয়ামী লীগে প্রবল হয়েছে ভোটের হাওয়া।
এদিকে ভোটের আগে দলের কোনো পর্যায়ে যেন মান অভিমান না থাকে, সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন লিটন। গঠন করা হয়েছে বেশকিছু কমিটি। দলে কোনো সমন্বয়হীনতা আছে কি না, থাকলে কেন, কীভাবে তা মেটানো যায়, তা নিয়েই কাজ করছে এসব কমিটি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলের কোন্দল বা বিরোধ মেটানোর এই চেষ্টাকে আদর্শও বলছে। গত ২২ ফেব্র্বয়ারি রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় লিটনের পৰে মেয়র নির্বাচনে ভোট চাওয়া হয়। মূলত এরপরই ভোটের এসব প্রস্তুতি শুর্ব হয় আওয়ামী লীগে।
২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী শহরের চেহারা পাল্টে দিলেও পাঁচ বছর আগে সিটি নির্বাচনে হেরে যান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন। মেয়র হন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। কিন্তু তারপরও জাতীয় চার নেতার অন্যতম এএইচএম কামার্বজ্জামানের ছেলে লিটনের বিকল্প কেউ এই নগরে নেই বলেই মনে করেছে ৰমতাসীন দল।
কেন তার বিকল্প নেই, জানতে চাইলে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মীর ইকবাল বলেন, ‘খায়র্বজ্জামান লিটনের মতো নেতাও যেমন রাজশাহীতে নেই, তেমনি তার মতো শাসকও নেই। ফলে অন্য কেউ প্রার্থী হতে চান না।’ জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে এমনিতেই জেলা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা মাথা ঘামান না। এখনও কেউ প্রার্থী হতে চান না। সবার লৰ্য, শুধু লিটনকেই মেয়র নির্বাচিত করা।’
রাজশাহী আওয়ামী লীগের হাল ধরে ধীরে ধীরে দলকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছেন লিটন। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ২০০৮ সালের মেয়র নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন তিনি। তবে পরের সিটি নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে রাজশাহীতে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের আগে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের হটাতে অভিযানের পর রাজশাহীতে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠে পুলিশের বির্বদ্ধে। এর সবই যায় লিটনের বির্বদ্ধে।
নিজের পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে লিটন সব সময়ই বলে থাকেন, নির্বাচনের আগে শাপলা চত্বর নিয়ে হেফাজতে ইসলামের অপপ্রচার। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও এই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে। তারা ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের সদস্য, যেগুলোর বেশিরভাগই বিএনপির সঙ্গে সে সময় জোটবদ্ধ ইসলামী ঐক্যজোটের অংশ ছিল।
অবশ্য মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মীর ইকবাল মনে করেন পরাজয়ের কারণ ছিল নিজেদের মধ্যেই। তিনি বলেন, বড় দলে অনেক সময় মান-অভিমান থাকে। নির্বাচন এলে সেগুলো মাথাচাড়া দেয়। ভোটের আগে নেতাকর্মীদের সে মান ভাঙানো যায়নি। ফলে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছিল। আর এ কারণেই ব্যাপক উন্নয়ন করা সত্ত্বেও হেরে যান লিটন। তবে এবার নিজেদের সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলা হয়েছে।
এবার ভোটের আগে নেতাকর্মীদের মান-অভিমান বা বিভেদ দূর করতে পুরো শহরে কাজ করছে ১১টি কমিটি। এক একটি কমিটির আওতায় রয়েছে আরও চারটি করে উপকমিটি। এসব উপকমিটির বিস্তার পাড়ায়-পাড়ায়, মহলৱায়-মহলৱায়। উপকমিটিতে রাখা হয়েছে সর্বনিম্ন ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ১০১ জন সদস্য।
নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কাজ করছে পুরো শহরের ওই ১১টি কমিটি। তারা উপকমিটির মাধ্যমে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে চলেছে। এই উপকমিটিগুলোতে যে শুধু আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির পদধারী নেতারাই রয়েছেন, তা নয়। আছেন এলাকার বিশিষ্টজনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এসব কমিটি ও উপকমিটি প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মহলৱায় উঠান বৈঠকের আয়োজন করছে। তাতে উপস্থিত হয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করছেন এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন। এসব বৈঠকে নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকেই এভাবে নিজের পৰে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন লিটন।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, যেদিন কোথাও উঠান বৈঠক না থাকে, সেদিন পাড়া-মহলৱার বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন লিটন। নির্বাচনে জিততে তাদের কাছ থেকেই নিচ্ছেন নানা পরামর্শ। আবার নির্বাচনের দিন পোলিং এজেন্ট থেকে শুর্ব করে অন্যান্য কাজগুলো কোন কোন নেতাকর্মী করবেন তারও তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এদের একটি দল ঢাকা থেকে প্রশিৰণও নিয়ে এসেছে।
জানতে চাইলে এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন বলেন, ‘আমার সময়ে রাজশাহীর যে উন্নয়ন হয়েছে, তা এখনো মানুষ মনে রেখেছে। এই উন্নয়ন এখন থমকে গেছে। এখন জনগণ সেটা উপলব্ধি করছে। ফলে আবারও উন্নয়নের জন্যই জনগণ আমাকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাইছেন। এবার রাজশাহী নগরবাসী আর কোনো ভুল করতে চাইবে না।’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৬ জুন। ২১ জুলাই শপথ নেন মেয়র বুলবুল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাসের মধ্যে ফের ভোট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমপ্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুর্বল হুদা রাজশাহীতে এসেই জানিয়েছেন, ভোট হবে আগামী জুলাইয়ে।

Leave a Reply