বাড়ছে দেশি মাছের চাষ

18/04/2018 1:07 am0 commentsViews: 58

স্টাফ রিপোর্টার: প্রায় এক দশক ধরেই রাজশাহীতে বাড়ছে মাছ চাষ। কিন’ একের পর এক পুকুর খনন করে শুধু উচ্চ উৎপাদনশীল মাছের দিকেই বেশি ঝুঁকেছিলেন চাষিরা। এসব মাছের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছিল দেশি মাছ। তবে ইদানিং দেশি মাছ চাষের দিকেও ঝুঁকেছেন চাষিরা। তারা বলছেন, গেল কয়েক বছরে দেশি মাছের দাম বেড়ে গেছে অনেক। তাই তারা এখন দেশি মাছের দিকেই ঝুঁকছেন।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ গ্রামের মাছ চাষি কুরবান আলী বলেন, বিদেশি মাছের ভিড়ে অনেক দেশি মাছ ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে। অনেক প্রজাতি আবার বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আর বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে দেশি মাছের দাম দীর্ঘদিন ধরেই চড়া। সে কারণে তাদের এলাকায় আবারও বাণিজ্যিকভাবে দেশিয় মাছের প্রসার ঘটতে শুর্ব করেছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার আলোকছত্র গ্রামের বাসিন্দারা সরকারি একটি খাল ইজারা নিয়েছেন। আগে তারা খালটিতে উচ্চ উৎপাদনশীল মাছ চাষ করতেন। তবে গেল বছরের বন্যায় তাদের মাছ ভেসে যায়। বন্যার পর তারা আবার মাছ চাষ শুর্ব করেন। তবে এবার আর বিদেশি নয়, নানা প্রজাতির দেশি মাছ চাষ করেন তারা। সম্প্রতি গ্রামের লোকজন এই মাছগুলো ধরেন। বিক্রি করে দেখেন, দেশি মাছেই লাভ বেশি।
গ্রামের বাসিন্দা আফসার আলী বলছেন, এক সময় খাল, বিল-ডোবাতেও দেশি শোল, টেংরা, মাগুর ও শিং মাছ পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না বললেই চলে। তাই তারা এবার এই মাছগুলোই চাষ করেন। আগের বছরগুলোতে তারা যে লাভ করেছেন, দেশি মাছে লাভ হয়েছে তার দ্বিগুণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীসহ পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের জলাশয়গুলোতে র্বই-কাতলার পাশাপাশি দেশি মাগুর ও শিং মাছের চাষাবাদ বাড়ছে। কোথাও কোথাও র্বই-কাতলার পাশাপাশি মিশ্রিতভাবেও দেশি মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে পোনা খরচ বাদে অন্য কোন খরচ না থাকায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন মৎস্য চাষিরা। এভাবে মাছ চাষে ভালো লাভ হচ্ছে বলেই জানিয়েছেন চাষিরা।
তানোর উপজেলার সাহাপুর গ্রামের মৎস্যচাষী আশরাফুল ইসলাম গত এক বছর ধরে র্বই-কাতলার সাথে মিশ্রিত দেশি মাগুর চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন, ১৫ বছর ধরে তিনি প্রায় ২০ থেকে ২৫টি জলাশয় ইজারা নিয়ে র্বই-কাতলার মাছে চাষাবাদ করে আসছেন। অনেকদিন লোকসান গুণতে হয়েছিলো তাকে। এমন সময় গত বছর এক পোনা উৎপাদনকারীর পরামর্শে ১৬ বিঘার জলাশয়ে পরীক্ষামূলকভাবে র্বই-কাতলার সাথে মিশ্র করে পাঁচ হাজার পিস দেশি মাগুর চাষ শুর্ব করেন। এতে তার ভালো লাভ হয়।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, দেশি মাগুর চাষে পোনা খরচ ছাড়া অন্য কোন খরচ নেই। তাদের জন্য আলাদা কোন খাবারও দেওয়া লাগে না। এখন তার ২২টি পুকুরের মধ্যে ১৮টি পুকুরেই অন্য মাছের পাশাপাশি ৬০ হাজার পিস দেশি মাগুরের পোনা ছেড়ে রেখেছেন। সম্প্রতি এক পুকুর থেকে ২২০ কেজি দেশি মাগুর ধরে সিরাজগঞ্জের বাজারে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে এসেছেন।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি জলাশয় রয়েছে চার হাজার ৯১৫টি। বাণিজিক খামার রয়েছে ছয় হাজার। জেলায় মোট ৪৪ হাজার ৫২৩ হেক্টর জলাশয়ে মাছ চাষ হয়ে থাকে। বছরে মাছের উৎপাদন ৬৬ হাজার ৮২২ মেট্টিক টন। উৎপাদিত মাছ জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স’ানে বাজারজাত করা হচ্ছে। দেশি মাছের উৎপাদন আরও বাড়াতে মৎস্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সাহা জানান, রাজশাহীর পানি ও মাটি মাছ চাষের উপযোগী। কিন’ আগে র্বই-কাতলা ছাড়া দেশি মাছ চাষে চাষিরা আগ্রহী ছিলো না। তবে এখন লাভ দেখে তারা দেশি মাছ চাষ করছেন। মিশ্র চাষে মাগুর এবং কৈ মাছের সঙ্গেও শিং মাছ ভালো হয়। তাই জেলার অনেক মাছ চাষি এখন র্বই-কাতলার পাশাপাশি দেশি মাগুর-শিং মাছ চাষে ঝুঁকেছেন।
তিনি বলেন, মাছ চাষ ও জীবন্ত মাছ বাজারজাতকরণে দেশে রোলমডেল রাজশাহী জেলা। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এ জেলার মৎস্যখাত উলেৱখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৬৬ হাজার ৮২২ মেট্টিক টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় নিরাপদ মাছ চাষ প্রকল্প শুর্ব হয়েছে। এটি সফল হলে অচিরেই রাজশাহীর মাছ বহির্বিশ্বেও পাঠানো হবে।

Leave a Reply