নির্মাণশিল্পে স্থবিরতা

13/04/2018 1:10 am0 commentsViews: 42

তৈয়বুর রহমান: নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম সংকটে পড়েছে নির্মাণ শ্রমিক ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। একে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে অভিহিত করেছেন সংশিৱষ্টরা।
তাদের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। প্রতি টন রড ৫০ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। সিমেন্ট প্রতি ব্যাগ ৩৭০ টাকা হতে ৪৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইটের বেড়েছে প্রতি হাজারে ৫০০ টাকা করে আর বালি প্রতি ট্রাকে বেড়েছে ৫০০ টাকা। দ্বিগুণ বেড়েছে নির্মাণ সামগ্রীর পরিবহন খরচ। একই সাথে এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত আন্যান্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। চরম সংকটে পড়েছে ডেভেলপার। কাজও করতে পারছে না, কাজ ছেড়েও আসতে পারছে না তারা। বাধ্য হয়ে অনেকেই কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে। কাজ বন্ধ করে দিয়েছে অনেকেই।
সংশিৱষ্ট সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রডের দাম বৃদ্ধির জন্য মালিকদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয়েছে। একই দিন রি-রোলিং মিলস ও স্টিল মিলস্‌ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন- সিন্ডিকেট নয়, মূলত: পাঁচ কারণে রডের দাম বেড়েছে। কারণগুলো হলো- ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, রডের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বন্দর সমস্যা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যাই দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
এদিকে, মূল্য বৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। রিহ্যাব-এর পৰ থেকে বলা হয়েছে, আবাসন খাত আবার সংকটে পড়েছে। এটা নিয়ে সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। তারা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে উলেৱখযোগ্য কোনো লাভ হচ্ছে না। নির্মাণ সামগ্রীর দাম না কমলে ফ্ল্যাটের দাম ২০ থেকে ২২ শতাংশ বাড়বে। ফলে বেচাকেনা কমে যাবে। তাদের পৰ থেকে জানানো হয়েছে ইতোমধ্যে অনেকেই নির্মাণ কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে কাজ করছে।
কিছু কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ঠিকাদারগণ প্রকল্প বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছেন। এর ফলে দেশের উন্নয়ন কাজ অনেক পিছিয়ে পড়তে শুর্ব করেছে। সারা দেশে লৰ লৰ নির্মাণ শ্রমিক বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইমারত নির্মাণ শ্রমিক বাংলাদেশ-ইনসাব এর মতে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে ৫০ ভাগ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য স্বাভাবিক পর্যায়ে না আসলে এ শিল্প বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে বলে জানিয়েছেন সংশিৱষ্ট মহল।
নগরীর ফরিদ প্রপাটিজের সত্ত্বাধিকারী ফরিদ উদ্দিন বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে নির্মাণ কাজের সাথে সংশিৱষ্টরা বেশি ৰতিগ্রস্ত হয়েছে। কাজ ছাড়তেও পারছে না। ইচ্ছা মত কাজও করা যাচ্ছে না। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। রাজশাহীর অন্যান্য ডেভেলপারগণ কাজের গতিও কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নির্মাণ শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে।
রাজশাহীর প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার বেলাল হোসেন বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে অবকাঠামো গত সকল উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রতি টন রডের মূল্য বেড়েছে ২০ হাজার টাকা। প্রতি বস্তা সিমেন্টের মূল্য বেড়েছে একশ’ থেকে একশ’ দশ টাকা করে। পরিবহন খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। এ মূল্য বৃদ্ধিতে সকল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন,এটা একটা সিন্ডিকেট চক্রের কাজ। সরকার ৮ বছরে যে উন্নয়ন কাজ করেছে তাকে মৱান করার জন্য নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেৱষকদের মতে সামনে আসছে নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন কাজ শুর্ব হতে যাচ্ছে। উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতেই নির্মাণ সামগ্রীর এই মূল্য বৃদ্ধি এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। এই সুযোগে অসৎ কতিপয় ব্যবসায়ী কিছু কামিয়ে নেয়ার ধান্দায় এই মূল্য বৃদ্ধি ঘটিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জনৈক সরকারি কর্মকর্তা জানান, আত্মসংযমের মাস রমজান মাসে যারা দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে টু-পাইস কামাতে ছাড়ে না তারা কি করে সহজে এ সুযোগ ছাড়বে তা সহজেই অনুমেয়।
ইতোমধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছে ইনসাব। এ মূল্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশও করেছে তারা। একে অসাধু ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন তারা। নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন এ কাজের সাথে সংশিৱষ্টরা।
নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাজশাহী স্টেডিয়াম মার্কেটের রড ব্যবসায়ী মেসার্স পাবনা আয়রণ স্টোরের সত্ত্বাধিকারী র্ববেল বলেন, ৩ মাস আগে যে রডের প্রতি টনের মূল্য ছিল ৫৫ হাজার টাকা সে রড মূল্য এখন ৬৮ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য কমার সম্ভাবনা আছে কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি তার কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেন নি।
নগরীর আরেক রড ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী আসাদুলৱাহ এন্ড ব্রাদার্সের সত্ত্বাধিকারী আসাদুলৱাহ সেলু বলেন, ইতোমধ্যে নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য কমতে শুর্ব করেছে। অচিরেই আরো দাম কমে যাবে বলে জানান।
এ সম্পর্কে ইনসাবের কেন্দ্রীয় সভাপতি রবিউল ইসলামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে সব থেকে বেশি ৰতির সম্মুখীন হয়েছে নির্মাণ শ্রমিকরা। তিনি বলেন, এটা অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একটি ষড়যন্ত্র। এতে ৩৭ লৰ নির্মাণ শ্রমিকের বেকার হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য কমানো না হলে এর বির্বদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেন।
বিগত ৩ মাসে ব্যবধানে বেশ কয়েক বার নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে বলে ইনসাবের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান হারাবার আশঙ্কা ও গভীর প্রকাশ করেছেন তারা।

Leave a Reply