নাখালপাড়ার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, নিহত ৩

13/01/2018 2:05 am0 commentsViews: 16

এফএনএস: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কয়েকশ গজ দূরে রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের একটি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে তিনজন নিহত হয়েছে। পুরনো এমপি হোস্টেলের পেছনে র্ববি ভিলা নামের ওই ছয় তলা বাড়ির পঞ্চম তলা থেকে তিনটি ইমেপ্রাভাইজড এক্সপেৱাসিভ ডিভাইস (আইইডি), বিস্ফোরক জেল ও একটি পিস্তল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ। র‌্যাবের উপ-পরিচালক মেজর মেহেদী হাসান বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে ওই ভবন র‌্যাব সদস্যরা ঘিরে ফেলেন। পরে গতকাল শুক্রবার ভোরের দিকে সেখানে গোলাগুলি হয়। সে সময় ওই ভবনের পঞ্চম তলার ‘জঙ্গি আস্তানা’ থেকে র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গ্রেনেডও ছোঁড়া হয় বলে জানান তিনি। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সকালে ঘটনাস’লের কাছে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল, যে এরকম জায়গায় জঙ্গিরা অবস’ান করছে, কোনো নাশকতার পরিকল্পনা করছে। এর ভিত্তিতে ছয় তলা ভবনটির পঞ্চম তলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে জঙ্গিদের সঙ্গে কিছু গোলাগুলি হয়, কিছু গ্রেনেডও নিক্ষেপ হয়। তার ব্রিফ্রিংয়ের কিছুক্ষণ পর র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেখানে পৌঁছে কাজ শুর্ব করে। সকাল ১০টার দিকে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর ঘটনাস’লে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, গত ৪ জানুয়ারি কয়েকজন তর্বণ পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে শুর্ব করে। ওই বাসার একটি ঘরে তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। সেখানে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে, যেগুলোর ছবি একই রকম, কিন’ একটিতে নাম লেখা হয়েছে জাহিদ, অন্যটিতে সজীব। এনআইডিগুলো জাল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান র‌্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, তাদের একজনের গায়ে সুইসাইড ভেস্ট ছিল। একজনের ডেডবডির নিচে একটি আইইডি রয়েছে। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলার ওপর আইইডি রেখে আগুন জ্বালিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছিল বলে মনে হয়েছে। কিন’ সে চেষ্টা সফল হয়নি। পরে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, পাঁচ তলার ওই ফ্ল্যাটে কক্ষ মোট তিনটি, সেখানে থাকতেন মোট সাতজন। ফ্ল্যাটে ঢোকার পর সোজা গেলে যে কক্ষটি, সেখানেই তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। আর বাকি দুই কক্ষ থেকে চারজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, র্ববি ভিলার ষষ্ঠ তলার দুই ইউনিটে দুটি মেস। আর পঞ্চম তলার দুই ইউনিটের মধ্যে একটিতে মেস, সেখানেই ছিল জঙ্গি আস্তানা। ভবনের বাকি ছয়টি ফ্ল্যাটে ফ্যামিলি বাসা, আর নিচতলায় গ্যারেজ। অভিযানের শুর্বতেই বাড়ির গ্যাস লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ভবনের নয়টি ফ্ল্যাট থেকে ৬১ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে দোতলায় বাড়িওয়ালার বাসায় রাখা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে জঙ্গিদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মুফতি মাহমুদ জানান। জানা গেছে, র্ববি ভিলার মালিকের নাম সাব্বির রহমান। এলাকার মানুষের সঙ্গে ওই পরিবারের খুব একটা মেলামেশা নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাদের তেমন দেখা যেত না। বাড়ির দেখভাল করতেন মূলত একজন কেয়ারটেকার। র্ববি ভিলার পেছনের বাড়ির বাসিন্দা বদর্বল (৩৫) বলেন, ভোর রাতে প্রচ- গোলাগুলির শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। সে সময় বাইরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। বদর্বল বলেন, র্ববি ভিলার মালিক সাব্বির একসময় বিমানের স্টুয়ার্ড ছিলেন বলে তারা শুনেছেন। বছর পনের আগে ওই নির্মাণ করেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। অভিযানে থাকা এক র‌্যাব সদস্য জানান, ওই ভবনের কেয়াটেকার র্ববেল এবং বাড়িওয়ালার ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তবে বাড়ির মালিককে পাওয়া যায়নি।
নিহত তিন জনের পরিচয়: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত তিনজনই জেএমবির সদস্য বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এ বাহিনীর গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান গতকাল শুক্রবার বিকালে অভিযান শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলন, ওই বাড়ির অন্য সব বাসিন্দাই নিরাপদে আছেন। নিহত তিনজনের বয়স ২৫ থেকে ২৭ এর মধ্যে। তাদের নাম-পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি তারা জেএমবি সদস্য। মুফতি মাহমুদ বলেন, জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার জন্য ওই বাড়ির কেয়ারটেকার র্ববেলকে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
সে বলেছে, জাহিদ নামের এক যুবক গত ২৮ ডিসেম্বর এসে পাঁচ তলার একটি কক্ষ ভাড়া নিতে চায়। জাহিদ তাকে বলেছিল, সে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। দুই ভাইকে নিয়ে ওই বাসায় সে থাকবে। এরপর ৪ জানুয়ারি ‘জাহিদ’ পরিচয় দেওয়া সেই যুবক বাসায় ওঠেন। বাকি দুজন ওঠেন ৮ জানুয়ারি। পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে তারা তিনজন থাকতেন। বাকি দুটি কক্ষে আগে থেকেই আরও চারজন থাকতেন। র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ বলেন, ওই ঘরে জাহিদের ছবিসহ দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। তার একটিতে নামের জায়গায় জাহিদ লেখা থাকলেও অন্যটিতে লেখা রয়েছে সজীব। জাহিদ খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে অনেক রাতে ফিরত। অন্য দুজন কখন কি করত সে বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি। মুফতি মাহমুদ বলেন, ওই বাড়িতে আস্তানা গড়ে জঙ্গিরা গুর্বত্বপূর্ণ স’াপনায় হামলাসহ নাশকতার পরিকল্পনা করলে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই র‌্যাব সেখানে অভিযান চালায়। তিনি জানান, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার চারটি ফ্ল্যাটের মধ্যে তিনটিই মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ওই তিন বাসায় ২১/২২ জন থাকত। আর পুরো ভবনে দশটি ফ্ল্যাটে ৬০ জনের বেশি মানুষের বসবাস। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কয়েকশ গজ দূরে পুরনো এমপি হোস্টেলের পেছনে ওই বাড়ি গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঘিরে ফেলেন র‌্যাব সদস্যরা। ভোরে এলাকাবাসীর ঘুম ভাঙে তুমুল গোলাগুলির শব্দে। পরে সকালে পঞ্চম তলার এক মেসে তিন তর্বণের লাশ পাওয়ার কথা জানান র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। সেই সঙ্গে সেখানে কয়েকটি ইমেপ্রাভাইজড এক্সপেৱাসিভ ডিভাইস (আইইডি), বিস্ফোরক জেল ও পিস্তল পাওয়ার কথা জানান তিনি। মুফতি মাহমুদ বলেন, একটি বিস্ফোরক রাখা ছিল গ্যাস বর্নারের ওপর। তাতে তাদের মনে হয়েছে, চুলার ওপর রেখে আগুন জ্বালিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিল জঙ্গিরা। কিন’ অভিযানের শুর্বতেই র‌্যাব ওই বাড়ির গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। জঙ্গিরা গ্যাস ছেড়ে দিয়ে ওইভাবে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে পুরো ভবনের বাসিন্দাদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত বলে জানান তিনি।
র্ববি ভিলায় আগেও হানা দিয়েছিল র‌্যাব-পুলিশ: যে বাড়িতে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে তিনজন নিহত হয়েছেন, সেখানে এর আগেও দুইবার হানা দিয়েছিল র‌্যাব-পুলিশ। এলাকাবাসী বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কয়েকশ গজ দূরে পুরনো এমপি হোস্টেলের পেছনে র্ববি ভিলা নামের ওই ছয় তলা বাড়ির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় মেস ভাড়া দেওয়া নিয়ে বহুদিন ধরেই তারা আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। স’ানীয়রা বলছেন, র্ববি ভিলার মালিক সাব্বির রহমান একসময় বিমানের স্টুয়ার্ড ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। ১৫ বছর আগে দুই কাঠা জমির উপর বাড়িটি নির্মাণ করেন তিনি। ওই পরিবারের সদস্যরা স’ানীয়দের সঙ্গে তেমন মেলামেশা না করলেও ষাটোর্ধ্ব সাব্বিরকে নিয়ে কোনো সন্দেহ তাদের হয়নি। র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, জঙ্গিদের অবস’ানের খবরে ২০১৬ সালের ১৪ অগাস্ট এবং ২০১৩ সালে দুই দফা ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পশ্চিম নাখালপাড়ার ৬০ নম্বর বাড়ির মালিক মো. নাসির হোসেন বলেন, ওই বাড়ির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হত, যা এলাকার অনেকেই পছন্দ করতেন না। ২০১৬ সালের ১৪ অগাস্ট র্ববি ভিলায় র‌্যাব-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১০/১২ জনকে ধরে নিয়ে যায় বলেও জানান তিনি। বাড়ির মালিক সাব্বির বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না জানিয়ে নাসির বলেন, ওই বাড়ি তার স্ত্রীর নামে, তাদের একজন ছেলে আছে। তবে সাব্বিরের আচার-আচরণে আমাদের কখনও কোনো সন্দেহ হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাতের অভিযানের বিবরণ দিয়ে নাসির বলেন, গভীর রাতে বিকট শব্দ শুনে নিচে নেমে আসি। র‌্যাব সদস্যরা আমাকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে। তারা জানায়, ওই বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে। ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত থেমে থেমে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার কথা জানান নাসির ও আশপাশের বাড়ির বাসিন্দারা। র্ববি ভিলার পেছনের বাড়িতে বসবাসকারী বদর্বল (৩৫) বলেন, রাতে প্রচ- গোলাগুলির শব্দে ঘুম বেঙে যায়। ওই সময় বাইরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। থেমে থেমে গুলির শব্দ হাচ্ছিল। র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ঘটনাস’লে সাংবাদিকদের বলেন, গত ৪ জানুয়ারি কয়েকজন তর্বণ পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে শুর্ব করে। ওই বাসার একটি ঘরে তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অভিযানে থাকা এক র‌্যাব সদস্য জানান, ওই ভবনের কেয়াটেকার র্ববেল এবং বাড়িওয়ালার ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তবে বাড়ির মালিককে পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply