অধ্যৰকে চেনেন না শিৰার্থীরা!

07/12/2017 2:06 am0 commentsViews: 31

রিমন রহমান: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পুরান তাহিরপুর বিএম কারিগরি কলেজ থেকে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন নান্টু ইসলাম। কিন্তু নান্টু তার কলেজের অধ্যৰকে চিনতেন না। গতকাল বুধবারই নান্টু প্রথম তার কলেজ অধ্যৰর মুখ দেখেছেন। অধ্যৰ রেজাউল ইসলামের কৰে তার সামনেই এমন কথা বললেন নান্টু।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰ রেজাউল ইসলাম অবশ্য এর প্রতিবাদ করলেন না। বললেন, এই কলেজ থেকে তিনি কোনো বেতন পান না। তাই অন্য একটি কলেজে শিৰকতা করেন। এ জন্য এই কলেজে তার আসা হয় না। শিৰার্থীরা বলছেন, কলেজের একজন শিৰক ও একজন অফিস সহকারী ছাড়া তারা কাউকে চেনেন না।
দুর্গাপুরের প্রত্যন্ত এলাকার এই কলেজটি থেকে এবার ১৬ জন শিৰার্থী এইচএসসি পরীৰায় অংশ নেন। ফল প্রকাশ হলে ১০ শিৰার্থীকে মার্কশীটে পাস দেখানো হলেও অনলাইনে দেখানো হয় ফেল। পরে সংবাদ সম্মেলন করে শিৰার্থীরা অভিযোগ তোলেন, বাংলাদেশ কারিগরি শিৰাবোর্ডের পরীৰা নিয়ন্ত্রক তাদের ফলাফল ঠিক করে দেয়ার জন্য দুই লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন।
কিন্তু তার চাহিদামতো তিন লাখ টাকা না দেয়ায় অনলাইনে তাদের পাস দেখানো হচ্ছে না। শিৰার্থীদের এই সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশিত হলে পরদিনই তাদের অনলাইনেও পাস দেখানো হয়। শিৰাবোর্ডের এমন কা-ে হইচই শুর্ব হয় বিভিন্ন মহলে। প্রশ্ন ওঠে কলেজটির শিৰকদের ভূমিকা নিয়েও।
এসব বিষয় তদন্ত করতে গতকাল সকালে কলেজে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আনোয়ার সাদাত। সেখানে ভুক্তভোগী শিৰার্থীদেরও ডাকা হয়। এ সময় ইউএনও, কলেজের শিৰক এবং সংবাদকর্মীদের সামনেই শিৰকদের বির্বদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন শিৰার্থীরা। তারা বলেন, সারা বছরই বন্ধ থাকে এই কলেজ।
শিৰার্থীরা বলেছেন- তারা শুনেছেন, কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰসহ শিৰকের সংখ্যা পাঁচজন। কিন্তু তারা শুধু একজন শিৰক ও অফিস সহকারীকে চেনেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰকেও আগে কখনও দেখেননি। ইউএনও’র আগমন উপলৰে গতকালই প্রথম ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰকে তারা কলেজে দেখলেন।
কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পাস করা ছাত্রী সুমাইয়া খাতুন বলেন, বছরে একদিনও ক্লাস হয় না কলেজে। কলেজের শ্রেণিকৰগুলো ভাড়া রয়েছে স্থানীয় আরেকজন কলেজ শিৰকের কাছে। তিনি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিৰার্থীদের সেখানে কোচিং করান। তাদের ফলাফল নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে তারা বার বার কলেজে গিয়েও একদিনও শিৰকদের পাননি।
সুমাইয়া বলেন, কলেজের অফিস সহকারী সাহেব আলী আরেকটি স্কুলে চাকরি করেন। সেখানে গিয়ে তারা তাকে ফলাফল নিয়ে জটিলতার বিষয়টি জানান। ফলাফল ঠিক করতে ঢাকা যাওয়ার জন্য তারা অফিস সহকারীকে টাকাও দেন। অফিস সহকারী তাদের জানান, এই টাকা নিয়ে তিনি এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰ ঢাকায় শিৰাবোর্ডে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা এর সমাধান করতে পারেননি।
কলেজে ইউএনও’র আগমনে সেখানে আশপাশের বাসিন্দারাও ভিড় জমান। এদের মধ্যে থেকে বাবর আলী শেখ ও সোলাইমান আলী নামে দুই ব্যক্তি জানালেন, অন্তত দুই বছর ধরে তারা কলেজটিতে কোনো ক্লাস চলতে দেখছেন না। কলেজের ক্লাসের বদলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেখানে কোচিং চলে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কলেজটিতে সেমিপাকা মোট চারটি শ্রেণিকৰ এবং একটি অফিসকৰ। সে দিনও কোনো ক্লাস চলছিল না কলেজে। দেখা যায়নি বর্তমান কোনো শিৰার্থীকেও। ব্যবহার না হওয়ায় কলেজের শ্রেণিকৰগুলোর বেঞ্চ এবং শিৰকদের বসার চেয়ারগুলো পোকায় খেয়েছে। সেসব একপাশে সরিয়ে রেখে কোচিং সেন্টারের পৰ থেকে আনা হয়েছে আলাদা বেঞ্চ ও চেয়ার।
কলেজের চারপাশে ঝোপঝাড় আর কলাগাছ। দুটি টয়লেট থাকলেও তাতে নেই কোনো দরজা। তবে কলেজের পতাকা ওঠানো বাঁশটি দেখা গেছে কাঁচা। সেটি দেখিয়ে অভিভাবক আবদুল মালেক বললেন, কলেজের ক্লাস না চলায় পতাকাও ওঠানো হয় না। ইউএনও আসার খবরে নতুন বাঁশ কেটে এনে পতাকা তোলা হয়েছে।
কলেজের ছাত্র শওকত হোসেন বললেন, কারিগরি হলেও কলেজে কোনো কম্পিউটার নেই। কলেজের কম্পিউটার রাখা আছে অফিস সহকারীর বাড়িতে। আলমারিও ছিল সেখানে। ইউএনও’র আগমন উপলৰে আলমারিটি কলেজের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এখনও কম্পিউটার রয়েছে অফিস সহাকারীর বাড়িতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰ রেজাউল ইসলাম বলেন, কলেজে মূল্যবান জিনিস রাখলে চুরি হয়ে যায়। তাই সেগুলো অফিস সহকারীর বাড়িতে রাখা হয়। তিনি জানান, খাতা-কলমে কলেজে একজন নৈশ্য প্রহরী আছেন। কিন্তু বেতন না হওয়ার কারণে তিনিও যান না। নৈশ্য প্রহরীর মতো শিৰকরাও পেটের তাগিদে অন্য কোথাও কাজ করছেন।
কলেজে ক্লাস না চলার অভিযোগ স্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যৰ। স্বীকার করেছেন শ্রেণিকৰ কোচিং সেন্টারকে ভাড়া দেয়ার বিষয়টিও। তবে তিনি দাবি করেছেন, পরিস্থিতির কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার ১৩ বছরেও কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিৰক-কর্মচারিরা বেতন-ভাতা পান না। তাই কেউ কলেজেও আসেন না। কোনো রকমে খাতা-কলমে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।
কলেজটির বিষয়ে তদন্তের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ইউএনও আনোয়ার সাদাত। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিৰা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অশোক কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় এ ধরনের কলেজের ব্যাপারে খোঁজখবর পাওয়া যায় না। তবে এবার তারা এই কলেজটির ব্যাপারে খোঁজখবর নেবেন।

Leave a Reply