তৈয়বুর রহমান: লোকসানের কবলে পরেছে রাজশাহী চিনিকল। প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন চিনি অবিক্রিত থাকায় শতকোটি টাকা দেনায় ডুবে আছে চিনিকলটি। গত ঈদের পর মিল থেকে কোন চিনি বিক্রি হয়নি। এর ফলে ৮৩৪ জন শ্রমিকের চার মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। এ নিয়ে সুগার মিলে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। বেতন পরিশোধ না হলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে সিবিএর নেতারা।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশফাকুর রহমান বলেন, দেনা থাকলেও এর আগে চিনি বিক্রি করে শ্রমিকদের বেতন দিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু এখন চিনি বিক্রি না হওয়ায় শ্রমিকদের বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না । তিনি আরও জানান, বাজারে এখন প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকায়। আর মিলগেটে চিনি বিক্রির সরকারি রেট ৫০ টাকা। মিল গেটের চেয়ে বাজারে চিনির মূল্য কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চিনিকল থেকে চিনি কিনছেন না। চিনি বিক্রি না হওয়ায় অন্যান্য দেনার সাথে সাথে বাড়ছে শ্রমিকের পাওনা।
সুগার মিল গেটে যে চিনি বিক্রি হয় তা একেবারে বিশুদ্ধ চিনি। এটি সাধারণত মিলে উৎপাদিত র-সুগার দিয়ে চিনি তৈরি করা হয়। র-সুগারের স্থায়িত্ব হচ্ছে ৭২ ঘণ্টা। আর মিলে আখ মাড়ানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে র-সুগার দিয়ে চিনি উৎপাদন সম্পন্ন হয়। এর ফলে দেশিয় মিলে উৎপাদিত চিনি গুণাগুণের দিক থেকে উন্নতমানের হলেও দাম বেশি হওয়ায় বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। ফলে শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন দিতে পারছে না মিল কর্তৃপৰ।
অন্যদিকে বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে রিফাইন করা চিনি। বিদেশ থেকে আমদানি করা র-সুগার দিয়ে এ চিনি উৎপাদিত হয়। এসব র-সুগার সাধারণত ব্রাজিল,ইন্দোনেশিয়া, কিউবাসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। উক্ত র-সুগার হতে চিনি উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে মাত্র ২২ টাকা। আর ঐ সব চিনি কমদামে কিনে বাজারে ৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের দ্বিগুণ লাভ হয় । এক সূত্রে জানা গেছে, এই সব চিনি উৎপাদনে ফু্রকটজ নামক এক ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ফলে এ চিনি খেয়ে মস্তিষ্কে ডোপামাইন নিঃসরণ হয়। যার ফলে ড্রাগের নেশার মত আকর্ষণ সৃষ্টি হতে পারে। এ চিনি দেখতে ধবধবে সাদা ও সুন্দর হওয়ায় ক্রেতারা বাজার থেকে কিনতে আগ্রহী হয়।
এক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আমাদের মিলে এক কেজি চিনি উৎপাদন করতে খরচ পড়ে ১৫০ টাকা। সারা বছর চিনি উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলে বেশি পরিমাণ উৎপাদন করে গড়পড়তা খরচ কম পড়তো। কিন্তু আখের অভাবে বছরের অধিকাংশ সময় মিলগুলো বন্ধ থাকায় চিনির উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বিদেশ থেকে আমদানি করা র-সুগার থেকে উৎপাদিত চিনির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না চিনি কলগুলো। যা দেশের চিনি শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।
অন্যদিকে দেশে আখ উৎপাদনও কমছে। প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে আখের জমি। অতিতে এ অঞ্চলে প্রচুর আখ চাষ হতো। দেশে উৎপাদিত আখকে কেন্দ্র করেই এ অঞ্চলে স্থাপিত হয়েছিল অনেক চিনিকল। রাজশাহী চিনিকল তার অন্যতম।
রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠে পবা উপজেলার হরিয়ানে ১৯৬২ সালে চিনিকলটির নির্মাণ কাজ শুর্ব হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার এটিকে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চিনিকলটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর প্রতিবছর লোকসান দিয়ে আসছে। ফলে ঋণে জর্জরিত হয়ে আসছে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে সহায়তা কমে যাওয়ায় কৃষক আখ চাষও কমিয়ে দিয়েছে। লাভ বেশি হওয়ায় ঐ সব জমিতে উৎপাদন করছে আম,পেয়ারা,ধানসহ অন্যান্য ফসল। যে কারণে আখের জমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। মিলে দেখা দিচ্ছে আখের অভাব। আখের অভাবের কারণে দু-এক মাস চালু থেকে সারা বছর বন্ধ থাকছে চিনি কলগুলো। এর ফলে চিনির উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
চিনি বিক্রি না হওয়া প্রসঙ্গে রাজশাহী চিনিকলের সাবেক সিবিএ সাধারণ সম্পাদক জহুর্বল ইসলাম বলেন, চিনি শিল্পের সমস্যা সমাধানে ইৰু গবেষণা কেন্দ্র গুর্বত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের ধান, ফল গবেষণা কেন্দ্রগুলো গবেষণা চালিয়ে যেমন বিভিন্ন জাতের উন্নত মানের বীজ উৎপাদন করে খাদ্য সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রেখেছে তেমনি উচ্চ ফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের আখ উৎপাদন করে দেশের চিনি শিল্পকে বাঁচাতে পারে।পাশাপাশি র-সুগার আমদানিও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। এছাড়া মাথাভারি প্রশাসন ও দুর্নীতি মোকবিলা করতে ব্যর্থ হওয়ায় চিনি শিল্প মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে।
গত চার মাসে শ্রমিকদের বেতন বাবদ বাকি পড়েছে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। রাজশাহী চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বেতন না দেওয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা দেন দরবার চালিয়ে আসছে। এখন চিনি উৎপাদনের মৌসুম না হওয়ায় কাজের পরিমাণ খুবই কম। তাই বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে অসহায় শ্রমিক ।
রাজশাহী চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আফাজ উদ্দিন বলেন, সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণেও চিনিকল কখনো লাভের মুখ দেখে না। এ জন্য শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পান না। চিনি বিক্রি হলে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া কোনো ব্যাপার ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে দেনার পরিমাণ কতো তা স্পষ্ট করে জানাননি চিনিকলের জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) সায়েম বিন সোলায়মান। তবে তিনি বলেন, দেনার পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা তো হবেই। ঋণ নিয়ে আখ কেনা হয়, আবার চিনি বিক্রি করে ঋণ শোধ করা হয় না। এভাবেই ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে।
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে চিনিকলের এমডি আশফাকুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপৰকে জানিয়েছি। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।