সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভরসা ‘ইচ্ছে’

12/11/2017 1:05 am0 commentsViews: 61

হাসান আদিব, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চিকিৎসা কেন্দ্রের সামনের রাসৱা হয়ে বিনোদপুর ফটকের দিকে একটু এগিয়ে চোখে পড়ে কৃষি প্রকল্পের পুরাতন খামার বাড়ি। যার ঝুপড়ি বারান্দায় প্রতিদিন বিকেলে দেখা মেলে ১৫/২০ জন কোমলমতি শিশুর। প্রত্যেকের হাতে খাতা-কলম। হেলে-দুলে উচ্চস্বরে তারা পড়ে- ‘অ-আ-ই-ঈ…’ ‘ক-খ-গ-ঘ…’ অথবা ‘অ-ই-ঈ-উৃ’। শিশুদের সব হাসি-তামাশা-দুষ্টুমি আর ছোটাছুটি সামলে বই পড়াচ্ছেন কিছু তরম্নণ-তরম্নণী। দিনের পড়া শেষে পরবর্তী ক্লাসে আগ্রহ বাড়াতে শিশুদের মধ্যে বিলি করা হয় মজার খাবার। যার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়-য়া কিছু স্বপ্নবাজ তরম্নণ-তরম্নণীর উদ্যোগে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গড়ে তোলা ‘ইচ্ছে’ -এর স্কুল কার্যক্রম।
‘মেধা দেই, শ্রম দেই, আর্ত-মানবতার সেবা করি, পৃথিবীকে বদলে দেই’ সেস্নাগানকে বুকে ধারণ করে রাবির কয়েকজন মেধাবী তরম্নণ-তরম্নণীর নিরলস পরিশ্রমের ফল এই স্কুলটি। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মির্জাপুর এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে পাঁচ বছর আগে রাবির কয়েকজন শিৰার্র্থী মিলে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরম্ন থেকে জায়গার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের খামার বাড়ির বারান্দায় স্কুলটির পাঠদান কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে স্কুলটির শিৰার্থীর সংখ্যা ১৪ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১৫ জন শিৰার্থী প্রতিদিন তিনজনের একটি দল করে সপ্তাহে ৬ দিন তারা স্কুলটিতে ক্লাস নেন। স্কুলটি থেকে এ পর্যনৱ দুই শতাধিক শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিৰার যাত্রা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, স্কুলটি পরিচালনার জন্য তারা কারও কাছ থেকে কোন প্রকার আর্থিক সহযোগিতা নেন না। অর্থের যোগানের জন্য বিভিন্ন দিবসে ক্যাম্পাসে ফুল, পিঠা, বই ইত্যাদির দোকান দিয়ে থাকেন। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলে তারা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিক্রি করেন। এই লাভের পুরো টাকাই ব্যয় করা হয় স্কুল পরিচালনার কাজে।
স্কুলের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলার জন্য বিভিন্ন সময় চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা এবং খেলাধূলার আয়োজনের পাশাপাশি ঈদের সময় তাদের নতুন জামা-কাপড় দেওয়া হয়। পড়া শেষে পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককেই খাবার দেওয়া হয়। এতে করে স্কুলমুখী হচ্ছে শিশুরা। এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি মির্জাপুরের একটি স্কুলের এখন ওরা নিয়মিত শিৰার্থী। ‘ইচ্ছে স্কুল’-এ আসার আগে এসব শিশুরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স’ানে ভিৰাবৃত্তি করে বেড়াতো। স্কুলের এক শিশু শিৰার্থী জানায় সে প্রতিদিনই স্কুলে আসে। প্রতিদিন ক্লাস করে। তার এই স্কুলে আসতে ভাল লাগে। স্যারেরাও তাকে অনেক আদর করে। ঈদের সময় জামা কাপড় কিনে দেয়।
স্কুলটি আজ তাদের নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এমনটিই জানান ‘ইচ্ছে’র সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো বাচ্চাগুলোকে পুরোপুরি শিৰিত করতে পারবো না। তবে এটা আশা করি এখান থেকে তারা অনৱত নৈতিক মূল্যবোধটা শিখবে। আর তারা তাদের মৌলিক অধিকার সর্ম্পকে সচেতন হবে। আমাদের এই ৰুদ্র প্রচেষ্টায় ওরা যদি সামান্যতম জ্ঞানও অর্জন করে তাহলেই আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
জানতে চাইলে ‘ইচ্ছে’র উপদেষ্টা অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিৰার্থী ওমর ফারম্নক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুপ্ত প্রতিভাগুলোকে জাগিয়ে তোলার। আমাদের মতো যদি বাংলাদেশের প্রতিটি শিৰিত সমাজ এবং সরকার এগিয়ে আগে তাহলে এই পথশিশুদের শিৰার আলো দিয়ে একদিন সারা বাংলাদেশ আলোকিত হবে।’
‘ইচ্ছে’র কার্যক্রমের প্রশংসায় সংগঠনটির উপদেষ্টা রাবির সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক সাদেকুল আরেফিন মাতিন বলেন, ‘কোন ধরনের অনুদান না নিয়ে নিজেদের প্রচেষ্টায় যেভাবে সংগঠনটি চলছে, সেই ধারণাটি দেশের প্রত্যেকটি উচ্চশিৰা প্রতিষ্ঠানের শিৰার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়-ক। এই ধারণাকে লালন করে তরম্নণরা এগিয়ে আসলে আমাদের সমাজের সকল অপকর্ম একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ জন্ম নেবে বলেও আমি আশাবাদী।’
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে ১২ ফেব্রম্নয়ারি স্বেচ্ছাসেবীমূলক সংগঠন হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। সমাজের অবহেলিত শিশুদের শিৰাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক ও অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করার লৰ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কয়েকজন শিৰার্থী এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন।

Leave a Reply