বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দশম সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্রাজুয়েটদের নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত রেখে জাতির প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মোহাম্মদ আবদুল হামিদ।
গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, তোমাদের আজকের এ অবস্থানের জন্য তোমাদের পিতা-মাতা, শিৰক, সমাজ, দেশ ও জনগণের ব্যাপক অবদান রয়েছে। তোমরা সবার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে মেধা, প্রজ্ঞা ও কর্ম দিয়ে জাতির আশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও বিবেক জাগ্রত রাখবে। অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করবে না। মনে রাখবে- এই সমাবর্তন শিৰার সমাপ্তি ঘোষণা করছে না, বরং উচ্চতর শিৰার জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশের দ্বার উন্মোচন করছে।
ছাত্র রাজনীতিতে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের ভিতকে মজবুত করতে হলে দেশে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। সেই নেতৃত্ব তৈরি হবে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই। এৰেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কোনো স্থান থাকবে না। ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব থাকবে ছাত্রদের হাতে। লেজুড়বৃত্তি ও পরনির্ভরতা দূর করতে ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
গ্রাজুয়েটসহ সকল শিৰার্র্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র দেশের শিৰাঙ্গণে মৌলবাদ ও উগ্রবাদ উসকে দেয়। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ৰুণ্নের অপচেষ্টা চালায়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। এজন্য শিৰার্থীরা যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারে, সে ব্যাপারেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আরও বলেন, জাতির অমিত শক্তি যুবসমাজ। যুবসমাজের শক্তি ও সম্ভাবনাকে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে হবে। উচ্চশিৰা যাতে সার্টিফিকেট সর্বস্ব না হয় কিংবা শিৰা যাতে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত না হয়; তা দেশ ও জাতির স্বার্থে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তোমরা সফল হও। আমি তোমাদের উজ্জল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
গতকাল শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিৰামন্ত্রী নুর্বল ইসলাম নাহিদ। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় শিৰামন্ত্রী নুর্বল ইসলাম নাহিদ বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। শহীদ ড. শামসুজ্জোহাসহ আরও অনেক শিৰকের রক্তের সাৰী এই বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চ ডিগ্রি অর্জন শেষে আপনারা এখন নতুন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছেন। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত। আপনাদের এ পর্যায়ে আসার পেছনে দেশের জনগণের গুর্বত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের প্রতি আপনাদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাদের প্রত্যাশা পূরণে জনগণ ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
সমাবর্তন বক্তা ইমিরেটাস অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন বলেন, শিৰকদের পাঠদানে অবহেলা, যথাসময়ে ফল প্রকাশে অনীহা কিংবা পৰপাতমূলক আচরণের অভিযোগ শোনা যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু উচ্চশিৰার মানের অবনতি হয়নি, পরীৰা পদ্ধতিও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অবস্থা এমন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একে অন্যের মূল্যায়নের ওপর আস্থা রাখতে চায় না। এ থেকে উত্তরণে সব পৰকে দেশপ্রেম ও নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে কাজ করার বিকল্প নেই।
এর আগে দুপুর সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করেন। এসময় তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিকাল ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের শুর্বর আগে দুটি আবাসিক হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গ্রাজুয়েট ও এমফিল-পিএইচডি গবেষকদের ডিগ্রি প্রদানের পর দুই প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও সেলিনা হোসেনকে বাংলা সাহিত্যে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পৰ থেকে রাষ্ট্রপতি ডি-লিট উপাধি প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা ও অধ্যাপক ড. চৌধূরী মো. জাকারিয়া, কোষাধ্যৰ একেএম মোস্তাফিজুর রহমান আল আরিফ প্রমূখ। ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এমএ বারী।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়র্বজ্জামান লিটন, সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, বেগম আকতার জাহান, আয়েন উদ্দিন, বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর-রহমান, জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদেরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
পরে সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন দেশসেরা কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।