রহস্যময় মাদ্রাসার কাছে কোণঠাসা এক পরিবার

10/10/2017 1:06 am0 commentsViews: 105

স্টাফ রিপোর্টার ও তানোর প্রতিনিধি: মাদ্রাসাটিতে শিৰার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০০ জন। আর শিৰক ১৩ জন। তবে গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন শিৰার্থী মাদ্রাসায় যায়। আর শিৰক যান কোনো দিন একজন অথবা দুজন। রাজশাহীর তানোর উপজেলায় মাদ্রাসাটির অবস্থান। নাম ‘পাঁচন্দর মহিলা দাখিল মাদ্রাসা’।
গ্রামবাসীর কাছে মাদ্রাসাটির কার্যক্রম খুবই রহস্যময়। এমন একটি মাদ্রাসার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে গ্রামের একটি পরিবার। গ্রামের আবু বাক্কার সিদ্দিক নামে এক ব্যক্তির ২০ শতাংশ জমির কিছু অংশ এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে মাদ্রাসাটি। আবু বাক্কারের দাবি, অবশিষ্ট জমিটুকুও ছেড়ে দেয়ার জন্য তাকে দেয়া হচ্ছে হুমকি।
এ নিয়ে ভুক্তভোগী এই ব্যক্তি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘শাহাদাত-ই আল হিকমা’র পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা মাদ্রাসাটি তার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেয়া জমি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। মাদ্রাসা কর্তৃপৰের হুমকিতে এখন তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আবু বাক্কার জানান, স্বাধীনতার আগে থেকেই পাঁচন্দর গ্রামের একটি খাস জমির ওপরে তার বাবার মাটির দোতলা বাড়ি ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৯ সালের দিকে তিনি ২০ শতক ওই জমিটি সরকারের কাছ থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেন। পরবর্তীতে তার বাবার মৃত্যুর পর তারা অন্যত্র বাড়ি করেন। এর কয়েক বছর পর তাদের ওই জমির পাশে গড়ে ওঠে একটি মহিলা মাদ্রাসা। সে মাদ্রাসাটিই এখন তার পুরো জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে।
তিনি জানান, মাদ্রাসা কর্তৃপৰ প্রথমে তার কাছে রাস্তা করার জন্য কিছু জমি চায়। তিনি সে জমি স্ট্যাম্পে লিখেও দেন। কথা ছিল, এর বেশি পরিমাণ জমি দাবি করবে না মাদ্রাসা। কিন্তু এর কিছু দিন পরই মাদ্রাসা কর্তৃপৰ জোর করে তার জমি দখল করে ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা দেয়। বসিয়ে দেয়া হয় একটি সাইনবোর্ডও। এর প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধামকি দেয়া হয়।
আবু বাক্কার জানান, সম্প্রতি তার জমিতে বাড়ি করার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয় বিষয়টি মু-ুমালা পৌরসভার ওপর ছেড়ে দেয়। পৌরসভা আবু বাক্কারকে জমির ওপর বাড়ি করার অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি জমির একাংশে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুর্ব করলেই মাদ্রাসা কর্তৃপৰের কথায় কাজ বন্ধ করে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শওকাত আলী।
ভুক্তভোগী আবু বাক্কার আরও জানান, জমি ছেড়ে না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। অথচ তার জমির যে অংশ জোর করে দখল করে ঈদগাহ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে গ্রামের কেউ নামাজ পড়েন না। বাইরে থেকে অপরিচিত লোকজন এনে ঈদের নামাজ আদায় করে মাদ্রাসা কর্তৃপৰ। আর মাদ্রাসায় পাঠদান না হলেও আনাগোনা রয়েছে বাইরের অচেনা লোকদের। এ বিষয়টি খুবই রহস্যজনক।
গত রোববার বেলা ১১টার দিকে পাঁচন্দর এলাকার ওই জমিটিতে গিয়ে দেখা যায়, আবু বাক্কারের বাবার আগের মাটির বাড়ির চিহ্ন এখনও আছে। আবু বাক্কারের বন্দোবস্ত নেয়া ২০ শতাংশ জমির মধ্যে দিয়ে এখন একটি পাকা রাস্তাও হয়েছে। রাস্তার পশ্চিম পাশের জায়গাটিতে বসানো হয়েছে ঈদগাহর সাইনবোর্ড। এর পশ্চিমপাশেই মাদ্রাসাটির অবস্থান।
মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা গেল, টিন দিয়ে তৈরি কয়েকটি শ্রেণিকৰ। কোনো কৰেই ক্লাস চলছে না। দেখা মিলল না কোনো শিৰকেরও। মাদ্রাসা চত্বরেই চুলো বানিয়ে খিঁচুড়ি রান্না করছে বিভিন্ন শ্রেণির ১০-১৫ জন শিৰার্থী। তারা জানালো, কোনো শিৰক আসেনি। তাই তারা বাড়ি থেকে চাল-ডাল এনে পিকনিক করছে। দুপুরে খেয়ে তারা বাড়ি ফিরবে।
কিছুৰণ পর খবর পেয়ে ছুটে এলেন মাদ্রাসার সুপার নাসির উদ্দিন। বললেন, নিয়মিত বেতন-ভাতা হয় না, তাই প্রতিদিন মাদ্রাসা আসেন না শিৰকরা। রোববারও কেউ আসেনি। তিনি জানান, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসায় শিৰার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০০ জন। আর শিৰকের সংখ্যা ১৩ জন।
জমি দখলের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদ্রাসা সুপার বলেন, ‘আমরা জায়গাটিতে অনেক দিন থেকেই নামাজ পড়ে আসছি। জায়গাটি আগে গর্ত ছিল, সেটা ভরাট করে ঈদগাহ বানানো হয়েছে। ঈদগাহের জন্য আলাদা কমিটিও করা হয়েছে। আমরা জায়গাটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিতে চাই।’
লিজ নেয়ার আগেই সাইনবোর্ড কেন- জানতে চাইলে নাসির উদ্দিন দাবি করেন, জায়গাটি খাস। আবু বাক্কার যতটুকু জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন, তার ভেতর এই জায়গাটুকু নেই। তাই জমিটি দখলে রাখতে তারা ঈদগাহর সাইনবোর্ড বসিয়েছেন। তবে এ নিয়ে আবু বাক্কারকে কোনো হুমকি দেয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা জামিলুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। বর্তমান সুপার নাসির উদ্দিন তার চাচাতো ভাই। জামিলুর রহমান দীর্ঘ দিন উপজেলা জামায়াতের আমীর ছিলেন। তিনিই জমি কিনে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই আল হিকমার নামে তিনি মাদ্রাসাটির জমি দলিল করে দেন।
রাজশাহীতে ২০০৩ সালের ফেব্র্বয়ারিতে শাহাদাত-ই আল হিকমা গড়ে ওঠে। এর প্রতিষ্ঠাতা কাওসার হুসাইন সিদ্দিকীর সঙ্গে জামায়াত নেতা জামিলুর রহমানের ছিল ঘনিষ্ঠতা। ২০০৪ সালের নভেম্বরে নগরীতে সরকারের বির্বদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে সংবাদ সম্মেলন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন সহযোগীসহ ধরা পড়েন কাওসার। এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। সরকার ওই সময় জঙ্গি সংগঠন আখ্যায়িত করে শাহাদাত-ই আল হিকমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাউদ ইব্রাহিমের অর্থায়নে কাওসার হুসাইন সিদ্দিকী শাহাদত-ই-আল হিকমা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে জামায়াত-শিবির ও শিৰক শ্রেণির কিছু মানুষের সমর্থন ছিল। নিষিদ্ধ ঘোষণার পর সংগঠনটি কৌশল বদল করে আপাতত পাঠ চক্র এবং খেলাফত সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করছে। সংগঠনটির সমমনা কিছু মাদ্রাসায় গোপনে চলে এসব কর্মকা-।
পাঁচন্দর মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সঙ্গে শাহাদত-ই-আল হিকমার সম্পর্ক রয়েছে কি না জানতে চাইলে তানোরের ইউএনও শওকাত আলী বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়ার জন্য তিনি থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেবেন। এ মাদ্রাসার জমি দখলের চেষ্টার ব্যাপারে ইউএনও বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন। এটি সমাধানের চেষ্টা তিনি করছেন।

Leave a Reply