নির্যাতন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

13/09/2017 1:07 am0 commentsViews: 12

এফএনএস: কঙবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং ক্যাম্পের শরণার্থীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা মিয়ানমার সরকারের কাছে অনুরোধ করব, তারা যেন নিরীহ মানুষের উপর নির্যাতন বন্ধ করে। তারা যেন প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে। এ ৰেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্য করা দরকার, আমরা তা করব। মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও এ দেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন সরকারপ্রধান।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিমানে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে প্রথমে কঙবাজার এবং সেখান থেকে সড়কপথে উখিয়ায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নারী, পুর্বষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সংৰিপ্ত বক্তৃতা করেন এবং শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। রোহিঙ্গা নারীরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তারা একবস্ত্রে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন। সঙ্গে করে কিছুই আনতে পারেননি। এ সময় নারী ও শিশুদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে চোখ ভিজে ওঠে শেখ হাসিনার। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাকেও চোখ মুছতে দেখা যায়। পরে সংৰিপ্ত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের ঘটনাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বাষ্পর্বদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, এ ঘটনা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। মানুষের কেন এত কষ্ট! রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের দিকটি তুলে করে শেখ হাসিনা বলেন, নাফ নদীতে শত শত নারী শিশুর লাশ ভাসছে, এটা ‘মানবতাবিরোধী’ কাজ। আমরা আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানবতার খাতিরে এই দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। যতদিন মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে না যাবে, ততদিন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করব। গত ২৪ অগাস্ট রাতে পুলিশ পোস্ট ও সেনা ক্যাম্পে হামলার ঘটনার পর থেকে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে চালানো হচ্ছে হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ। যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন, তারা ছুটে আসছেন বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। গত কয়েক দশক ধরে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসা বাংলাদেশে এই দফায় আরও তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বলে ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। এই শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের পৰ থেকে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতেও তারা রাজি নয়। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব দিয়ে নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ করে দিতে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ দেওয়ার একটি প্রস্তাব গত সোমবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। সেই প্রসঙ্গ টেনে কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। নিরাপত্তা দিতে হবে যেন ভালোমত বাঁচতে পারে। তাদের সঙ্গে যেন অমানবিক আচরণ করা না হয়। মিয়ানমারের ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার প্রসঙ্গ উলেৱখ করে তিনি বলেন, আইন পরিবর্তন করে কেন এই ঘটনার সৃষ্টি করা হল? এই ঘটনা না ঘটলে নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার হত না। ভুক্তভোগী কারা? নিরীহ মানুষ। কীভাবে তাদের উপর অত্যাচার হয়েছে! এই অবস্থা সত্যি সহ্য করা যায় না। কেন এই অত্যাচার? তারা তো তাদের নিজেদের দেশেরই লোক। রাখাইন রাজ্যে বর্ডার পুলিশ, সীমান্তরৰীদের চৌকিতে হামলার ঘটনায় যারা দায়ী, তাদেরও কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার বন্ধ করে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। বাংলাদেশের ভূমি থেকে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের চেষ্টা যাতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি মিয়ানমারে দুই পৰকে মানবিক আচরণ দেখাতে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। রাখাইন রাজ্যে বর্ডার পুলিশ, সীমান্তরৰীদের চৌকিতে হামলার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যাদের জন্য এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তারা নিজেরাই দেখুক, তাদের মা-বোন ও শিশুদের উপর কী নির্যাতন হচ্ছে। তাদের অপকর্মের জন্য লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া। সমস্যা থাকলে তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানোর কথাও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিজ দেশের জনগণ অন্য দেশের শরণার্থী হিসেবে থাকা সম্মানজনক না। এ উপলব্ধি থেকে মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি চায়, সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু অন্যায়কে ‘বরদাশত করা যায় না’। কঙবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেন, যারা আশ্রয়ের জন্য এসেছে, তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়। শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের নামে কেউ যেন ‘নিজের ভাগ্য গড়ার খেলা’ খেলতে না পারে- সে ব্যাপারেও সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা ছাড়াও তার পুত্রবধূ আইওএম কর্মকর্তা পেপ্পি সিদ্দিক এ সময় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, কঙবাজার-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, মন্ত্রী পরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উখিয়ায় আসেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, কঙবাজারের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও উখিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের পরিস্থিতিতে দেখতে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকরাও বুধবার কঙবাজারে যাবেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন।

Leave a Reply