ইটের ঠেকায় খাঁচার নেট তার ভেতরে অজগর!

06/09/2017 1:06 am0 commentsViews: 51

রিমন রহমান: রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামার্বজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার একটি খাঁচায় রাখা হয়েছে ১৯ ফুট লম্বা একটি অজগর সাপ। গত সোমবার রাতে জেলা ও দায়রা জজের সরকারি বাংলোর ভেতর থেকে সাপটি উদ্ধারের পর পাখি রাখা এই খাঁচাটিতেই তাকে রাখা হয়।
কিন্তু আড়াই বছর আগে পাশের এমন একটি খাঁচা থেকেই পালিয়েছিল একটি অজগরের বাচ্চা। লম্বায় ওই সাপটি ছিল ৮ থেকে ৯ ফুট। পালিয়ে যাওয়ার কিছু দিন আগে সাপটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় সীমান্তে ধরা পড়েছিল। সাপটি খাঁচা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর রাজশাহী চিড়িয়াখানায় কোনো অজগর সাপ ছিল না।
হঠাৎ করে বিচারকের বাংলোয় পাওয়া গেল মস্ত এক অজগর। সাপটি ধরার পর চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা তাদের খাঁচাতেই রেখেছেন। কিন্তু যে খাঁচায় রাখা হয়েছে সেটিও অনেক দুর্বল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জীর্ণশীর্ণ একটি খাঁচাতে রাখা হয়েছে অজগরটি। খাঁচার নিচের দিকে বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে নেট। তার ভেতর ঘাপটি মেরে শুয়ে ছিল অজগরটি।
ওই সময় অজগরটির খাবার হিসেবে খাঁচার ভেতরে আস্ত একটি মুরগি থাকলেও সেদিকে ভ্র্বৰেপ ছিল না অজগরটির। ওই খাঁচাটির দুই পাশের খাঁচাগুলোর সবই পাখির। সেসব খাঁচার সামনে দর্শনার্থীদের ভিড়। আবদুল গাফফার নামে এক দর্শনার্থী বললেন, যে মাপের খাঁচা তাতে পুরো শরীর ছড়িয়ে থাকতে পারবে না অজগরটি।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্য প্রাণী প্রজনন ও সংরৰণকেন্দ্রের অধ্যাপক ও পরিচালক বহিরাঙ্গণ বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ আ.ন.ম আমিনুর রহমান বলেন, চিড়িয়াখানায় যে পরিবেশে সাপটিকে রাখা হয়েছে তা মোটেও উপযোগী নয়। এই গরমে অজগর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টাই পানিতে শরীর ডুবিয়ে মুখ তুলে বসে থাকে। আর শুকনো জায়গায় অজগরের শরীরের নিচে থাকতে হবে মাটি। তা না হলে সাপটি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
এ ব্যাপারে চিড়িয়াখানার মনিটরিং অফিসার শেখ আবু জাফর বলেন, আকস্মিকভাবে সাপটি পাওয়ায় আগের মতো খাঁচাতেই তাকে রাখা হয়েছে। কোনো দর্শনার্থী যেন লাঠি দিয়ে সাপটিকে বিরক্ত করতে না পারে সেজন্য নেটের নিচে ইটগুলো দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, খাঁচার ভেতরে একটি গাছের ডাল দেয়া হয়েছে, এতে সাপটি সেখানে উঠে বসতে পারবে। খুব শিগগির নতুন খাঁচা তৈরি করে সাপটির উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সাপটিকে উদ্ধারের পর চিড়িয়াখানা কর্তৃপৰ দাবি করে আসছে, এটিই তাদের হারিয়ে যাওয়া অজগর। তবে ভিন্ন কথা বলছেন সাপ বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহীর পবা উপজেলার ‘স্নেক রেসকিউ অ্যান্ড স্টাডি’ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা বোরহান বিশ্বাস রোমেন বলেন, ৮-৯ ফুট লম্বা একটি বাচ্চা অজগর আড়াই বছর পর কখনোই ১৯ ফুট লম্বা হবে না। অজগরের দৈহিক বৃদ্ধি এতো বেশি নয়। আড়াই বছরে সাপটি সর্বোচ্চ তিন থেকে চার ফুট লম্বা হতে পারে।
তিনি বলেন, চিড়িয়াখানা কর্তৃপৰ দাবি করছেন- অজগরটি ভারতীয় ‘রকি’ প্রজাতির। কিন্তু এটি ‘বার্মিজ’ প্রজাতির সাপ। বাংলাদেশে শুধু রকি, বার্মিজ এবং রেটিকুলেটেড প্রজাতির অজগর পাওয়া যায়। বোরহান বিশ্বাস দাবি করেন, তিনি খবর পেয়েছেন বন্যার পানিতে ভারত থেকে অজগর সাপ আসছে। গত এক মাসে গোদাগাড়ীর পদ্মাপাড়ের কয়েকটি গ্রাম ও চরে অন্তত ১৫টি অজগর সাপ মেরে ফেলা হয়েছে। এই সাপটিও বানের পানিতে ভেসে এসেছে বলে ধারণা করছেন তিনি।
একই কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ড লাইফ বায়োলজিস্ট ফয়সাল আহমেদ পিয়াস। তিনি বলেন, অজগর এক স্থানে বসে থাকার প্রাণী নয়। সে প্রতিনিয়ত আবাসস্থল পরিবর্তন করে। আড়াই বছর ধরে সাপটি বিচারকের বাংলোর মতো সংরৰিত এলাকায় থাকলেও সে কারও না কারও চোখে পড়তো। তাই তিনিও ধারণা করছেন বাংলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদী থেকেই উঠে এসেছে সাপটি।
তবে চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. ফরহাদ উদ্দিন বলেছেন, আড়াই বছর আগে অজগরের খাঁচায় চিড়িয়াখানার যেসব কর্মীরা খাবার দিতে যেতেন, তারাই নিশ্চিত করছেন এটি সেই হারিয়ে যাওয়া অজগর। আর সাপটিকে চিড়িয়াখানার খুব কাছেই পাওয়া গেছে। তাই তারা মনে করছেন, এটিই তাদের হারিয়ে যাওয়া অজগর।

Leave a Reply