বিচারের নামে অমানবিকতা কাম্য নয়

১০/০৫/২০১৭ ১:০৪ পূর্বাহ্ণ০ commentsViews: 27

বিচার যখন অমানবিকতায় রূপ নেয় তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা  বেড়ে যায়। ইদানিং এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে যেখানে অমানবিকতা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। খুন, হামলা, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ ভয়াবহতা ছড়াতে শুর্ব করেছে। কন্যাশিশুকে ধর্ষণের বিচার চাইতে না পেরে তাকে নিয়ে অসহায় পিতাকে ট্রেনের তলায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছে। সহকর্মীর হাতে ধর্ষণের বিচার না পেয়ে নারী পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা বা বখাটে যুবকের হাতে লাঞ্ছিত তর্বণীর গলায় দড়ি দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা সমাজের সুস’তার, মানবিকতার পরিচয় তুলে ধরে না। গ্রামাঞ্চলে অবস’াটি এর চেয়ে ভালো নয়। সেখানে বিচার-সালিশের নামেও দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতার শেষ থাকে না।
রাজশাহীর তানোর থানার এক ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক গ্রাম্য সালিশে জরিমানা, জুতাপেটা, কান ধরে উঠাবসা ও থুথু চাটানোর পরও নির্যাতনের শিকার হয়ে ৰোভে, লজ্জায় মানসিকভাবে ভেঙে যুবকের আত্মহত্যার খবর গতকালের সোনালী সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।
গতবছর অক্টোবরের ২৮ তারিখে খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনায় সরনজাই ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত সালিশ বৈঠকে অভিযুক্ত দিনমজুরকে দোষি সাব্যস্ত করে ৫শ টাকা জরিমানা, ১০ ঘা জুতা, ১০ বার কানধরে উঠাবসা ও থুথু মাটিতে ফেলে চেটে খাওয়ার রায় দেন ইউপি চেয়ারম্যান। রায় মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও চাপের মুখে তা পালন করে লজ্জায়-ৰোভে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে  ওই যুবক। পরদিন গ্রামের চায়ের দোকানে অভিযোগকারীরাই তাকে মাটিতে ফেলে লোহার রড, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসায় সুস’্য হলেও মানসিক অসুস’তা নিয়েই তার দিন কাটছিল।
এই ঘটনায় আহত যুবকের স্ত্রী থানায় মামলা করলে উল্টো প্রবল চাপের মুখে পড়ে দরিদ্র পরিবারটি। এতে আরও  মনমরা হয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গত রোববার গভীর রাতে সে গলায় গামছা বেঁধে আমগাছে ঝুলে চিরশান্তির পথ খুঁজে নেয়।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বোঝা যায়, সামান্য মারপিটে অভিযুক্ত দিনমজুর যুবককে কতটা কঠিন শাস্তি মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে। বিচার অতটা অমানবিক না হলেও কি চলতো না? যে কোনো সুস’্য স্বাভাবিক মানুষের পৰে এমন অপমানজনক পরিসি’তি মেনে নেওয়া কঠিন বৈকি। গ্রাম্য মাতব্বর, চেয়ারম্যান যারা বিচার সালিশে অভ্যস্ত তাদের তো বিষয়টি গুর্বত্বের সাথে আমলে নেওয়া উচিত ছিল। যদি পরবর্তী মারপিটে জড়িতদের বিচার হতো তবে হয় তো এমন পরিণতি এড়ানো যেত। এই অবহেলা ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। এ ৰেত্রে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ উঠলে কাউকে দোষ দেওয়া যাবে কি?
বিচার-সালিশ করা গুর্বদায়িত্বের কাজ। বিচারের মূল উদ্দেশ্যই অপরাধ দমন ও অপরাধীকে সংশোধন করা। সামাজিক বিচারে বিষয়টি আরও গুর্বত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামাজিকভাবে অপমান, অপদস্ত করার ফল প্রায় ৰেত্রেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাই মানবিকতার সীমা লংঘন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ভুলে গেলে বিচারের উদ্দেশ্যটাই হারিয়ে যায়। অবশ্য ৰমতার দম্ভ বা প্রতিপৰকে নাজেহাল করার বিষয়টা ভিন্ন কথা।
আমরা গ্রাম্য বিচার-সালিশে মীমাংসা ও মানবিকতার ওপর জোর দিতে চাই। অমানবিকতা দিয়ে আর যাই হোক সামাজিক বিরোধ-বিশৃঙ্খলা মিটমাট করা যায় না। এমনটা কারোই কাম্য হতে পারে না।

Leave a Reply