রাওধার কৰের ফ্যান ও হোস্টেলের ফুটেজ জব্দ

21/04/2017 1:08 am0 commentsViews: 33

স্টাফ রিপোর্টার: যে ফ্যানে ঝুলে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মালদ্বীপের মডেল রাওধা আতিফ আত্মহত্যা করেছেন বলে বলা হচ্ছে, সে ফ্যানটি পরীৰার জন্য খুলে নিয়ে গেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পাশাপাশি পুরো হোস্টেলের সিসিটিভির ফুটেজও জব্দ করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সিআইডি’র উচ্চ পর্যায়ের একটি দল নগরীর নওদাপাড়ায় ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলটিতে তদন্ত করতে যান। এ সময় রাওধার কৰের ফ্যান ও সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করা হয়। সিআইডি কর্মকর্তারা এ দিন হোস্টেলের ছাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেন। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা হোস্টেল থেকে বের হয়ে যান।
এ সময় সিআইডির রাজশাহী বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ফ্যান জব্দ করার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলা হচ্ছে, এই ফ্যানটিতে ঝুলেই রাওধা আত্মহত্যা করেছেন। তাই আমরা ফ্যানটি পরীৰা করে দেখবো। এ জন্য ফ্যানটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফ্যানে যদি ৫০-৫৫ কেজির কিছু ঝোলে, তবে সেখানে একটি চাপ পড়বে। যারা চাপ মাপেন, আমরা তাদের কাছে ফ্যানটি নিয়ে যাব। তারা পরীৰা করে দেখবেন ফ্যানটিতে আদৌ এই চাপ পড়েছে কী না। ফ্যানে কিছু ঝুললে কিছু দাগও থাকবে। পরীৰার মাধ্যমে আমরা সেই বিষয়গুলো নিশ্চিত হতে চাই।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, রাওধাকে হত্যার বিষয়টি আমরা এখনো কোনোভাবে নিশ্চিত হতে পারিনি। নিশ্চিত হলে বলতাম। চিকিৎসক বলছেন, আত্মহত্যা, বাবা বলছেন, হত্যা। চিকিৎসকের মতো আমরা সরাসরি আত্মহত্যা বলছি না। ঘটনা যাই হোক, আমরা নিশ্চিত হয়েই বলবো।
সিআইডির ২০-২৫ জনের ওই দলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আসমাউল হকও ছিলেন। তিনি বলেন, ফ্যানের পাশাপাশি আমরা হোস্টেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও জব্দ করেছি। ঘটনার আগে ও পরের সিসিটিভির ফুটেজ আছে। কিন’ ঘটনার দিনের কেন নেই! আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। ফুটেজের হার্ডডিস্কটিই নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা এটিও পরীৰা করবো। এতে জানা যাবে, ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে, নাকি রেকর্ড হয়নি।
সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোস্টেলের ভেতর সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে তাদের সঙ্গে ছিলেন রাওধা আতিফের বাবা ডা. মোহাম্মদ আতিফ। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, রাওধার ঘরের দরজা আটকে সিআইডি কর্মকর্তারা বার বার সজোরে ধাক্কা দিয়ে সেটি খোলার চেষ্টা করেছেন। কিন’ দরজা খোলেনি, ভেঙেও যায়নি। তাহলে ঘটনার দিন কীভাবে খুলল? এটা একটা বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, সিআইডি কর্মকর্তারা হোস্টেলের ছাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। কেউ দেখেনি, রাওধা ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল। মালদ্বীপের ছাত্রীরা সিআইডিকে বলেছে, লাশ বিছানায় ছিল। পুলিশ আসার আগে কেন লাশ নামানো হলো? এটাও একটা বড় প্রশ্ন। পরীৰার আগের রাতে রাওধাকে জুসের সঙ্গে কেন ট্যাবলেট মিশিয়ে খেতে দেওয়া হয়েছিল? আগে থেকেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, গত ২৯ মার্চ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেল থেকে রাওধার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাওধা এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিৰার্থী ছিলেন। রাওধা ছিলেন মালদ্বীপের একজন উঠতি মডেল। মাত্র একুশ বছরের রাওধার ছিল আন্তর্জাতিক খ্যাতি।
রাওধার লাশ উদ্ধারের দিন কলেজ কর্তৃপৰ পুলিশকে জানিয়েছে, রাওধা ভেতর থেকে দরজা আটকে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শিৰার্থীরা দরজা ভেঙে তার ঝুলন্ত লাশ নামিয়েছেন। এ ঘটনায় ওই দিনই কলেজ কর্তৃপৰ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে।
এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) মর্গে রাওধার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্তকারী মেডিকেল বোর্ডের তিন সদস্যর দু’জনই ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিৰক। তাদের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাওধা আত্মহত্যা করেছেন। তবে এই প্রতিবেদন মানতে নারাজ রাওধার বাবা।
গত ১ এপ্রিল মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত ও পরিবারের সদস্যদের উপসি’তিতে রাজশাহী নগরীর হেতেমখাঁ কবরস’ানে রাওধাকে দাফন করা হয়। এরপর মালদ্বীপের দুই পুলিশ কর্মকর্তা রাজশাহীতে এসে ঘটনা তদন্ত করেন। দেশে ফিরে গিয়ে তারা জানান, রাওধাকে হত্যার কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
রাওধার মৃত্যুর ঘটনায় কলেজের পৰ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে কমিটিও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাওধা আত্মহত্যা করেছেন। তবে গত ১০ এপ্রিল রাওধার বাবা ডা. মোহাম্মদ আতিফ রাজশাহীর আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকে তিনি রাজশাহীতেই অবস’ান করছেন।
রাওধা হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাওধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ মামলায় রাওধার সহপাঠি সিরাত পারভীন মাহমুদকে (২১) একমাত্র আসামি করা হয়েছে। সিরাতের বাড়ি ভারতের কাশ্মিরে। সিরাতের বির্বদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
সিআইডি বলছে, হত্যার প্রমাণ না মিললে গ্রেপ্তার করা হবে না সিরাতকে। তবে এরই মধ্যে তার পাসপোর্ট অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। সিরাত দেশত্যাগ করতে পারবেন না। পাশাপাশি তাকে নজরদারির ভেতরেও রাখা হয়েছে।
রাওধার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি তদন্ত করছিলেন শাহ মখদুম থানার পরিদর্শক আনোয়ার আলী তুহীন। আর অপমৃত্যুর মামলাটি তদন্ত করছিলেন রাজশাহী মহানগর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক রাশিদুল ইসলাম।
রাওধার মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে তার কৰ থেকে জব্দ করা ল্যাপটপ ও মোবাইলের ফরেনসিক পরীৰার জন্য সেগুলো সিআইডির পরীৰাগারে পাঠিয়েছেন রাশিদুল ইসলাম। সে প্রতিবেদন এখনও ঢাকা থেকে আসেনি। এরই মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলা দুটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে সিআইডির পরিদর্শক আসমাউল হক রাওধার লাশের পুনরায় ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেন। এ জন্য গত ১৬ এপ্রিল তিনি আদালতে আবেদন করেন। ১৮ এপ্রিল আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করেন। পরিদর্শক আসমাউল হক জানিয়েছেন, রামেকের মর্গেই রাওধার লাশের দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্তে এবারো গঠন করা হবে মেডিকেল বোর্ড। কিন’ বোর্ড গঠন করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে লাশ উত্তোলনে বিলম্ব হচ্ছে। তবে দুই-তিন দিনের মধ্যে রাওধার লাশ তোলা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply