রাবির চার্বকলা চত্বরে প্রায় পাঁচশো ভাস্কর্য ওলট-পালট

19/04/2017 1:07 am0 commentsViews: 32

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) চার্বকলা অনুষদ চত্বরে শিৰার্থীদের বানানো প্রায় সাড়ে চারশ’ ভাস্কর্য উল্টে রাখার ঘটনা ঘটেছে। অনুষদ চত্বরে সীমানা প্রাচীর  নির্মাণ এবং বহিরাগতদের দৌরাত্মে ঠেকাতে কর্তৃপৰ যাতে ব্যবস’া গ্রহণ করে, এজন্য মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের ৭ জন শিৰার্থী সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পরে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ওই শিৰার্থীরা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দায় স্বীকার করে বিভাগের কাছে নিঃশর্ত ৰমাও চেয়েছেন।
তবে ঘটনায় চরম ৰোভ প্রকাশ করেছেন চার্বকলা অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগের শিৰক-শিৰার্থীসহ বিশিষ্ট জনেরা। ক্যাম্পাসে বিৰোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আর ঘটনায় জড়িত শিৰার্থীদের প্রায় দুই ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন বিভাগের শিৰক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। সেসময় শিৰার্থীরা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ৰমা চায়। পরে বিভাগে জর্বরী সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে ব্যবস’া গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোস্তফা শরীফ আনোয়ার।
জানতে চাইলে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘ঘটনা শুনে তাজ্জব বনে গেছি। যারা-এ নিন্দনীয় কাজ করেছে, তারা নাকি সবাই মাস্টার্সে পড়-য়া। পাঁচ বছর ধরে যে শিৰার্থীরা দিনরাত ভাস্কর্য তৈরিতে না খেয়ে লেগে থাকে, তারা ভাস্কর্য ওলট-পালট করে ফেলছে! এটা কীভাবে সম্ভব! শিল্পের মানুষ এমন বিকৃত মানসিকতার হতে পারে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। এতে স্পষ্টত কারও ইন্ধন রয়েছে বলে ধারণা করছি। খুব গুর্বত্বসহকারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰকে এটা তদন্ত করে দেখে ব্যবস’া গ্রহণ করা উচিত হবে। তা না হলে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীও এতে উৎসাহ বোধ করবে।’
ভাস্কর্য উল্টে ফেলার ঘটনা শুনে সকালে সেখানে ছুটে যান রাবি ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট্য নাট্য ব্যক্তিত্ব মলয় ভৌমিক। সেখানে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় জড়িত ছাত্ররা তাকে বাধা দেয়। ওই সময় তিনি জড়িত শিৰার্থীদের বলেন, ‘শিল্পের অমর্যাদা করে তোমরা শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েছ! এটা কোনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। তোমরা নিজেদের দাবি আদায়ে স্মারকলিপি দাও, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করো।
পরে অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, ‘সত্যিই যদি এটা প্রতিবাদ কিংবা দাবি আদায়ের কৌশল হত। তাহলে রাতের অন্ধকারে এটা ঘটত না, অন্য শিৰার্থীরাও জানতে পারত। তারাও অংশ নিত। এতে কোনো মহলের ইন্ধন থাকতে পারে বলে স্পষ্ট হয়েছে।’
বেলা সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে চার্বকলা অনুষদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, নতুন অনুষদ ভবনের পেছনে, ভাস্কর্য বিভাগের জন্য বরাদ্দ পুরোনো ভবনের সামনের পুরো অংশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ভাস্কর্য। শুধুমাত্র মাটির সঙ্গে শক্ত করে বসানো বড় তিন-চারটি ভাস্কর্য ছাড়া সব মাটিতে ওলট-পালট করে রাখা হয়েছে। তবে কোনো ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিৰক-শিৰার্থীরা ঘটনা শুনে সেখানে ভিড় করেছেন।
ভাস্কর্য বিভাগ সূত্র জানায়, পুরো এলাকায় প্রায় সাড়ে চারশ’ ভাস্কর্য রয়েছে। চার্বকলায় পড়-য়া প্রথম ব্যাচের শিৰার্থী থেকে বর্তমানে অধ্যয়নরতদের ভালো কাজগুলো সেখানে রাখা হয়েছে। তবে আর্থিক সংকট এবং প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে তা গুছিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। শিৰার্থীদের শ্রেণীকৰগুলোও ময়লা-আবর্জনায় স’প হয়ে থাকে। সেগুলো শিৰার্থীদেরই পরিস্কার করতে হয়। এসব বিষয়ে শিৰার্র্থীদের মধ্যে ৰোভ ছিল।
সোমবার রাতে চার্বকলা অনুষদ চত্বরে নৈশ প্রহরীর দায়িত্বে থাকা জামিল আহসান ও জোয়র্দার (ডাক নাম জোর-দা) জানান, রাতে ১২টার দিকে বেশ কিছু ছাত্র ভাস্কর্যের দিকে বসেছিল। প্রায়ই সময়ই রাতে তারা এখানে থাকে। আর তারা যেহেতু বিভাগের ছাত্র, তাই তারা সেভাবে খেয়াল করেন নি। সকালে বিষয়টি দেখতে পাই আমরা। তখন সকালে যে দায়িত্ব আসে, তাকে দিয়ে স্যারদেরকে বিষয়টি অবগত করানো হয়।
ঘটনায় যুক্তদের মধ্যে অন্যতম মাস্টার্সের শিৰার্থী ইউসুফ আলী স্বাধীন ও ইমরান হোসাইন রনি জানান, চার্বকলা চত্বরে নিয়মিত বহিরাগতরা এসে নেশা করে। শিৰার্থীদের সঙ্গে চরম মাত্রায় তারা দুর্ব্যবহার করে। প্রায়ই শিৰার্থীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বেও জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া তাদের বিভাগে (ভাস্কর্য) নিয়মিত ক্লাস, ভাস্কর্য নিমার্ণের কৰ পরিস্কারে জনবল দেয়া হয় না। নিজেদেরকে ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হয়। বিভাগে কোনো উন্নতি নেই, পড়াশোনা ও কাজেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন নেই। সবমিলিয়ে তারা (শিৰার্থীরা) এ সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে বিভাগের অন্য শিৰার্থীরা সুযোগ-সুবিধার সংকট ও তাতে ৰোভের কথা স্বীকার করলেও এ ধরনের প্রতিবাদের সঙ্গে একমত নন। তারা ভাস্কর্য উল্টে ফেলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিৰার্থী সঞ্জয় কুমার বলেন, আমরা নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও বিভাগের সংকট নিরসনের দাবির সঙ্গে একমত। কিন’ সেজন্য এভাবে শিল্পকর্ম অবমাননা করা উচিত হয় নি। এটার সঙ্গে শিৰার্থীরা একমত নন। অল্প কয়েকজন শিৰার্থী নিজেদের সিদ্ধান্তে এসব করেছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোস্তফা শরিফ আনোয়ার বলেন, ‘কয়েকজন শিৰার্থী মিলে যেটা করেছে, তাতে বিভাগ তথা গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ৰুন্ন হয়েছে। এটা প্রতিবাদের ধরন হতে পারে না। কেন তারা এটা করলো, তা যথাযথভাবে জানার জন্য তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তার বলছে- তারা ২৫/৩০ জন এটা করেছে। কিন’ আমরা ৭ জনকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। তাদের নাম-পরিচয় এখন জানাতে পারব না।’ তবে শিৰক কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের প্ররোচনা আছে কিনা তা জানা যায় নি বলেন তিনি।

Leave a Reply