বাঙালির উৎসব আজ

14/04/2017 1:08 am0 commentsViews: 12

শরীফ সুমন: নব আনন্দে জেগে ওঠার দিন আজ। আজ পহেলা বৈশাখ; বাঙালির উৎসবের দিন। পুরানো বছরের সকল অপ্রাপ্তি, বেদনা মুছে দিয়ে জীবনে নতুন সম্ভাবনার শিখা জ্বালাতে এসেছে পহেলা বৈশাখ। একটি নতুন মাস, একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা আজ। বৃহস্পতিবার চৈত্র সংক্রান্তির পড়ন্ত বেলার রোদের সঙ্গে সঙ্গে শেষ দিনটি কালের অতলে হারিয়ে গেছে। আজ পহেলা বৈশাখে লাখো প্রাণের স্পন্দনে প্রথম সূর্য কিরণের সঙ্গে জেগে উঠবে নতুন বাংলা বছর ‘১৪২৪’।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর সব বয়সের মানুষ লাল-সাদা রঙের নতুন পোশাক পরে নতুন বছরকে বরণের জন্য বিপুল উৎসাহে বের হয়ে আসবে রাজপথে। অধিকাংশের ঠিকানা হয়ে উঠবে পদ্মাপাড় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্বকলা বিভাগ। নতুনের আবাহনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরায়ত সুর অনুরণন তুলবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে- ‘এসো হে, বৈশাখ এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক’/।
জাতি, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই নয়, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে সবাই পয়লা বৈশাখে বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করবে। রাজশাহী মহানগরীসহ  বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মানুষ বাংলা গান, কবিতা, শোভাযাত্রা, নাচসহ নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করবেন। এজন্য নানা বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
নববর্ষ উপলৰে সকল রাজশাহী কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের বাঙালি খাবারের ব্যবস’া করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস’া থাকবে। বরেন্দ্র জাদুঘর ও প্রত্নস’ান, শহীদ এএইচএম কামার্বজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে (শিশু-কিশোর, প্রতিবন্ধী ও ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা টিকেটে)। এছাড়া সকল শিৰাপ্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব ব্যবস’াপনায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হবে।
বাংলা বর্ষের প্রচলন যেভাবে: একসময় বাংলায় নববর্ষ পালিত হত আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসাবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ঋতুনির্ভর। এই ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর আদায়ের সুবিধার জন্যই মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। প্রথমে এ সন ফসলি সন নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। আর বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নৰত্র ‘বিশাখা’র নাম থেকে। বিশাখা থেকে নাম হয়েছে বৈশাখ। ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ সামাজিক জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গিয়েছে। সেসময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার ও অন্য ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতো। পরদিন নববর্ষে ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতো। এ উপলৰে বিভিন্ন স’ানে মেলাসহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
পহেলা বৈশাখের দিনে উৎসবের শুর্বটা সেই আকবর আমলেই। এ দিনে তিনি মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ করা হত মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান-বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান। আজ আর খাজনা আদায় নেই। তবে ‘হালখাতা’ রয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী মহলে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান মানে নতুন অর্থ বছরের হিসাব খোলা। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে নতুন একটি ‘লাল কভারের’ খাতায় হিসাব খুলে নতুন উদ্যমে শুর্ব করা হয় ব্যবসা। সেখানে অতীতের ভুল-ভ্রান্তিগুলো পর্যালোচনা করা হয়। হালখাতা থেকে নেয়া হয় নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি।
রাজশাহীতে নববর্ষ উদযাপনে এবার ব্যাপক প্রস’তি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। দ্বিগুণ উৎসাহ ও উদ্দিপনায় তাই বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ উদযাপিত হবে। এ লৰ্যে মহানগর পুলিশের পৰ থেকে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস’াও নেওয়া হয়েছে।  রাজশাহী জেলা প্রশাসনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শুক্রবার সকাল ৮ টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুর্ব হয়ে রিভারভিউ কালেক্টরেট স্কুলে গিয়ে শেষ হবে। শোভাযাত্রা শেষে সেখানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে দুই দিনব্যাপী বৈশাখী ও শিশু আনন্দ মেলা এবং রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, সকল হাসপাতাল, শিশু পরিবার ও শিশু সদনে উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস’া, কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হবে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলৰে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস’া নিয়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি)। উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে নির্বিঘ্নে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উদযাপনের লৰ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস’া গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার (সদর) ইফতে খায়ের আলম নিরাত্তা ব্যবস’ার কথা জানিয়েছেন। উৎসব উদযাপনে বেশ কিছু নির্দেশনার কথাও জানান ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বৈশাখের অনুষ্ঠানে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে ঘটতে না পারে সেজন্য যে সকল স’ানে বৈশাখের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে সে সমস্ত স’ানে ও বিনোদন কেন্দ্রে আরএমপি পুলিশের পৰ থেকে নিরাপত্তামূলক ব্যবস’া থাকবে।
এছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারী থাকবে। নববর্ষের অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে উদযাপনের লৰ্যে নগরবাসীকে পরামর্শ অনুসরণেরও অনুরোধ করেন ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Leave a Reply