ভেজাল শিশুখাদ্যে ঝুঁকিতে শিশুস্বাস’্য

10/04/2017 1:09 am0 commentsViews: 50

রিমন রহমান: ভেজাল শিশুখাদ্যে ছেয়ে গেছে রাজশাহীর বাজার। গ্রাম কিংবা শহর-সবখানেই মানহীন শিশুখাদ্যের আধিক্য। প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই, তাই কোনো বাধা ছাড়াই গুঁড়োদুধ, চকলেট, জুস, আইসক্রিম থেকে শুর্ব করে প্যাকেটজাত বিভিন্ন ভেজাল শিশুখাদ্যের বিকিকিনি চলছে রাজশাহীজুড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিম্নমানের ভেজাল এসব খাদ্যপণ্য বাজারজাত করতে দোকানের সামনে সাঁটানো হচ্ছে চটকদার বিজ্ঞাপন। পাশাপাশি শিশুদের আকৃষ্ট করতে দেওয়া হচ্ছে বাহারি মোড়ক ও নানা উপহারের প্রলোভন। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার অজপাড়াগাঁয়ের ৰুদ্র মুদি দোকান থেকে শুর্ব করে শহরের নামি-দামি দোকানগুলোতেও মিলছে এসব ভেজাল খাদ্যপণ্য। এসব খাদ্য খেয়ে বড় ধরনের স্বাস’্য ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মোড়কে শুধু শিশুখাদ্যটির নাম থাকলেও উৎপাদকের নামই নেই। অনেক খাদ্যের প্যাকেটের গায়ে মেয়াদের তারিখ কিংবা পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস’া বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) কোনো সিল নেই। আবার অনেক প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআই-এর সিল থাকলেও নেই উৎপাদনের তারিখ কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার অলিতে-গলিতে গজিয়ে ওঠা লাইসেন্সবিহীন কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে এসব ভেজাল শিশুখাদ্য। নগরীর সপুরা ও কাটাখালি এলাকায় বেশ কয়েকটি কারখানা এসব পণ্য উৎপাদন করছে। এসব খাদ্যদ্রব্য পাইকারিতে কিনে শহরের দোকানগুলো ছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারে দেদারসে বিক্রি করা হচ্ছে। বেশি লাভের আশায় ৰুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করছেন।
রাজশাহীর আরডিএ মার্কেট ও নিউমার্কেটসহ কয়েকটি শিশুখাদ্যের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, বিএসটিআই-এর অনুমোদন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে শিশুদের মাইবয়, এলডো বেকি, লেকটোজেন, বেবি কেয়ার, মাদার স্মাইলসহ বিভিন্ন ধরনের চকলেট ও আইসক্রীম। অনেক খাদ্যের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা না থাকলেও রহস্যজনকভাবে বিএসটিআই-এর লোগো আছে ঠিকই। আবার অনেকগুলোর মোড়কও হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে ব্র্যান্ড কোম্পানীর মতই। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিরৰর শ্রেণির মানুষ বেশি প্রতারণার স্বীকার হচ্ছেন।
‘ডেইরি মিল্ক’ নামে একটি চকলেট হাতে নিয়ে দেখা যায়, চকলেটটির চমকপ্রদ মোড়কের গায়ে ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এবং প্রকৃত ওজন লেখার জন্য জায়গা রয়েছে। কিন’ প্যাকেটের ওই স’ানটি ফাঁকাই আছে। সেখানে কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি। প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে- ঢাকার বাড্ডা নয়ানগর এলাকার ‘লন্ডন ফুডস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চকলেটটি উৎপাদন করেছে।
একইভাবে নগরীর সাহেববাজার এলাকার একটি কনফেকশনারি দোকানে ‘তেঁতুল’ নামে একটি চকলেট ও ‘বেবি চয়েজ’ নামে একটি শুকনো দুধের কৌটায় উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী ফরিদ আহমেদ বলেন, তাড়াহুড়ো করে কিনেছি, এগুলো দেখা হয়নি। তাও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। পড়ে থাকছে না তো!
তবে বাজারের এসব শিশুখাদ্যর কোনটি আসল আর কোনটি নকল তা নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন অভিভাবক। ফারজানা ইয়াসমিন নামে এক শিশুর মা বলেন, এতো আকর্ষণীয় মোড়ক, বাচ্চারা দেখলেই নিতে চায়। কিন’ এসব খাদ্য মোটেও মানসম্মত নয়। এসব ভেজাল শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। কিন’ এসব বিক্রি বন্ধে প্রশাসন কোনো অভিযানই চালায় না।
আবু সাঈদ হোসাইন নামে এক বাবা বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির ফলের জুস, ড্রিংক, চুইংগাম, লেমনজুস, কনফেকশনারি, ডেইরিসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য শিশুদের খুবই পছন্দ। অথচ এসব খাদ্যের বেশির ভাগই মানসম্মত নয়। এগুলো আবার বিভিন্ন স্কুলের সামনে ভ্যারাইটিজ স্টোর, ছোট ছোট পান ও চায়ের দোকানে বিক্রি হচ্ছে। বাচ্চারা দেখামাত্রই এগুলো কিনে খাচ্ছে। এতে আমরা অভিভাবকেরা পড়েছি দুশ্চিন্তায়।
এদিকে এসব ভেজাল খাদ্য মারাত্মক স্বাস’্য ঝুঁকিসহ শিশুর বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. সানাউল হক বলছেন, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশুর ব্রেন, লিভার, কিডনি, ফুসফুসসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। ভেজাল খাদ্য শিশুদের দীর্ঘ মেয়াদি স্বাস’্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এছাড়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এসব ভেজাল খাদ্যবিরোধী অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতেখায়ের আলম ও র‌্যাব-৫ এর কোম্পানী কমান্ডার মেজর এএম আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, শুধু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তারা অভিযান চালান। তাই এ ব্যাপারে বিএসটিআই’কেই জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, এ বিষয়টি দেখার মূল দায়িত্ব তাদেরই। আর র‌্যাব-পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা পরিসি’তি স্বাভাবিক রাখতে আরও অনেক কাজ করতে হয়।
জানতে চাইলে বিএসটিআই’র রাজশাহী বিভাগের উপ-পরিচালক খাইর্বল ইসলাম বলেন, আমরা মাঝে মাঝেই অভিযান চালায়। কিছু ভেজাল শিশুখাদ্য রাজশাহীতেই উৎপাদন হচ্ছে। আবার কিছু পণ্য জেলার বাইরে থেকেও আসছে। ভেজাল শিশুখাদ্য বিক্রি হচ্ছে। আমরাও তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান চালাচ্ছি। আমরা এটি নির্মূল করার চেষ্টা করছি।

Leave a Reply