রাজশাহী বিভাগের ৫ জয়িতাকে সম্মাননা

06/04/2017 1:06 am0 commentsViews: 63

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিভাগের ৫ জয়িতা নারীকে সম্মাননা জানানো হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পৰ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলৰে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ডা: কায়সার রহমান চৌধুরী অডিটোরিয়ামে তাদেরকে এই সম্মাননা জানানো হয়। একই সাথে উক্ত অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিভাগের ৪০ জন জয়িতাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।
জয়িতা অনুষ্ঠানে বিচারকদের পর্যবেৰণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলা থেকে যে ৫ জন জয়িতাকে নির্বাচন করা হয় তারা হলেন- অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী রাজশাহীর উরসী মাহফিলা ফাতেহা উরসী ও শিৰা ও চাকরি ৰেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী নগরীর শিরীন মাহবুবা, সফল জননী নাটোরের নার্গিস সুলতানা ও নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যেমে জীবন শুর্ব করেছেন যে নারী নাটোর সদরের আয়েশা বেগম এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী সিরাজগঞ্জের আমিনা বেগম।
অনুষ্ঠানের শুর্বতে স্কাইপি কনফারেন্সের মাধ্যমে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এনডিসি নাছিমা বেগম বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেছন, সামাজে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী নারী জাগরণের অগ্রদ্র্বত। তিনি নারীর  উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূল থেকে জয়িতা নির্বাচন করা হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার নূর উর রহমানের সভাপতিত্বে জয়িতা সংবর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন, মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আনোয়ার হাবিব, মহানগর আ’লীগের সহসভাপতি সমাজসেবী শাহিন আকতার রেনী।  অনুষ্ঠানে সমন্বয়ক ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আমিনুল ইসলাম। এছাড়া উপসি’ত ছিলেন, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার আবু বাক্কার সিদ্দিকসহ সরকারি কর্মকর্তাগণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবগ।
বিভাগীয় পর্যায়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ৫ জন জয়িতাকে সনদ, ক্রেস্ট, উত্তরীয়, প্রাইজমানি বাবদ ১০ হাজার টাকা ও ৩৫ জন জয়িতাকে সনদ, ক্রেস্ট, প্রাইজমানি বাবদ ২ হাজার টাকাসহ সকল জয়িতাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ও নৃত্য অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
জয়িতাদের সংৰিপ্ত পরিচিতি:
উরসী মাহফিলা ফাতেহা
তাঁর পিতা মোজাহার্বল ইসলাম। ঠিকানা- ৩৪৭/২, উপশহর হাউজিং এস্টেট, সপুরা, থানা- বোয়ালিয়া, জেলা রাজশাহী। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর (চার্বকলা) পাস করেছেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি মাত্র ২০০০/- টাকা পূজি নিয়ে ব্যবসা শুর্ব করেছেন। তিনি বিভিন্ন ডিজাইন, বৱক বাটিক, স্কিনপ্রিন্ট প্রশিৰণ নিয়ে প্রগতি বুটিক স’াপন করেন । তার ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকলে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ‘সীইজ’ রাখেন। এরপর তিনি টেইলার্স/দর্জ্জি, ডিজাইন এর ট্রেনিং দিয়ে ১০০০ জন নারী কর্মীকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে এসএমই ঋণ গ্রহণ করে পোষাক তৈরি, বৱক বাটিক, মেশিন এমব্রয়ডারী প্রিন্ট, শোর্বম প্রতিষ্ঠা করেন । তার প্রতিষ্ঠানে ২০ জন দৰ কর্মী কাজে নিয়োজিত আছেন। তিনি ২০১৩ সালে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এসএমই মেলায় অংশ গ্রহণ করেন এবং সম্মাননা পান।
শিরীন মাহবুবা
তাঁর পিতা-মৃত আব্দুল হাসিব। ঠিকানা-বাড়ি নং-১১৮৪ মিয়াপাড়া, ডাক- ঘোড়ামারা, থানা-বোয়ালিয়া, জেলা রাজশাহী।     তিনি মাত্র ৬ বছর বষয়ে পোলিও রোগে আক্রান্ত হন এবং এক পায়ের শক্তি কমতে থাকে। তবুও অদম্য মনোবল নিয়ে রাজশাহী সরকারি পি.এন গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৯৭৯  সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সফলতার সাথে ১৯৮৯ সালে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন। শিৰাজীবন শেষে তিনি বাংলাদেশ দৃষ্টিহীন ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিওতে যোগদান করেন। সেখানে তিন বছর কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিৰা অফিসার, চারঘাট, রাজশাহীতে কর্মরত আছেন।
নার্গিস সুলতানা
তাঁর স্বামী- মৃত মোহাম্মদ আলী। গ্রাম- কামারপাড়া, ডাক- গুর্বদাসপুর, উপজেলা- গুর্বদাসপুর, জেলা নাটোর।     তিনি দশম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত অবস’ায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি তার স্বামীকে হারান। তখন তিনি তিন সন্তানের জননী।  সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তিনটি সন্তানকে আপন প্রত্যয়ে বড় করে তুলেছেন। ছোট একটি বাড়ি ভাড়া দিয়ে এবং কিছু জমিজমা দেখাশুনা করে তিনি সংসার চালিয়েছেন। পাশাপাশি দর্জির কাজ করে ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শিখিয়েছেন। অভিভাবকহীণ তিন সন্তানকেই তিনি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে লেখাপড়া করিয়েছেন এবং কর্মৰেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আয়েসা বেগম
তাঁর স্বামী-মো: সামছুর রহমান। গ্রাম- গোয়ালডাঙ্গা চাঁদপুর,ডাক-হরিশপুর উপজেলা- নাটোর সদর, জেলা নাটোর। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত এ বীরঙ্গণা নারী। তিনি ১৯৭১ সালে ৭ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে ২০শে নভেম্বর হতে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজাকার এবং পাক হানাদার বাহিনী আর্মি ক্যাম্পে তাকে আটকে রেখে তার উপর অমানুসিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। কিন্ত দেশ স্বধীন পরবর্তী সময়ে শুর্ব হয় তার জীবনে নির্যাতনের বিভিষীকাময় নতুন অধ্যায়। তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর তার স্বামী বীরঙ্গণা পরিচয় পাওয়ায় চালায় আকুন্ঠ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর ২টি সন্তানসহ শুর্ব হয় নতুন সংগ্রামের পথ। সমাজের সমস্ত প্রকিূলতাকে উপেৰা করে তিনি হাঁস মুরগী পালন ও সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বর্তমানে তিনি নাটোর সদর উপজেলার বড়হরিশপুর উউনিয়নের ১, ২, ৩ নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য হিসাবে সম্মানের সাথে দায়িত্ব  পালন করছেন।
আমিনা বেগম
তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৯-১৯৭০ সালের গণঅভ্যুথ্‌থানের সময় সিরাজগঞ্জে মহাবিদ্যালয়ের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্রলীগের মহিলা সম্পাদক ছিলেন। নিজের রাজনৈতিক অবস’ান থেকে মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিছু সময় ছাত্র সংসদের ভিপি, জিএস ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা জেলখানায় অবস’ান ও ওয়ারেন্ট থাকার কারণে অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে সিরাজগঞ্জে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ভারতের পাঙ্গা আর্মি ক্যাম্প থেকে অস্ত্র ও গোলাবার্বদ সংগ্রহ করে ৭নং সেক্টরে সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করেছেন।  শহর ও প্রত্যন্ত গ্রাম ঘুরে অসুস’ বীরঙ্গনাদের তালিকা প্রস’ত করে আবাসিকে রেখে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস’া করেছেন। ১৯৯৪ হতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তৃণমুল পর্যায়ে শতাধিক মহিলাকে নারী সংগঠন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং রেজিস্ট্রেশন প্রদানের ব্যবস’া করেছেন। ঢাকা ও ময়মনসিংহ পাঠিয়ে প্রশিৰণের ব্যবস’া করেছেন।

Leave a Reply