কোচিংমুখীতা বাড়ছে শিৰার্থীদের

05/04/2017 1:06 am0 commentsViews: 20

রিমন রহমান: প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় বেশকিছু বিষয়ের ঠিকমতো ক্লাস হছে না রাজশাহীর সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এমন অভিযোগ তুলেছেন। অবশ্য স্কুল কর্তৃপৰ বলছে, শিৰক সঙ্কটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে ঠিকই। তবে এক বিষয়ের শিৰককে দিয়ে অন্য বিষয়ের ক্লাস করানো হচ্ছে।
ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে রাজশাহীর সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে শুভ ইসলাম। অন্য স্কুলের চেয়ে এই স্কুলের শিক্ষার মান ভালো-এমনটা মনে করেই স্কুলটিতে ভর্তি হয় সে। কিন’ ক্লাস শুর্ব হতেই ধারণা পাল্টে যায় তার।
শুভ বলে, ভর্তি পরীক্ষার আগে মনে করেছিলাম স্কুলে ক্লাস করেই পরীক্ষার সিলেবাস সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন’ সেই ভরসা পাচ্ছি না। বিজ্ঞানের শিৰকের খুব অভাব এখানে। অন্য বিষয়ের শিৰকরা বিজ্ঞান পড়ান। এ জন্য পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করার জন্য এখন দুই বেলা কোচিংয়ে পড়ি।
কথা বলে জানা যায়, শুধু শুভ নয়, শিৰক সংকটে তার মতো হাজারো শিৰার্থীর ভরসা হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার। পরীক্ষার পাঠ্যসূচি শেষ করতে রাজশাহীর পাঁচটি সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের এখন সকাল-বিকেল ছুটে বেড়াতে হচ্ছে কোচিং সেন্টারে। এতে শিৰানগরীতে দিনে দিনে রমরমা হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ কোচিং ব্যবসা।
গত সোমবার রাজশাহীর তিনটি সরকারি স্কুল ঘুরে দেখা যায়, শিৰকের অভাবে ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেকে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ খেলাধুলায় ব্যস্ত। আবার অনেক শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে বসে একা একা পাঠ্যবই পড়তে দেখা যায়। শিৰার্থীরা বলেছে, যেসব বিষয়ের শিৰক নেই, সেসব বিষয়ের ক্লাসের কোনো খবর থাকে না।
রাজশাহীর একটি নামি সরকারি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে ফেরদৌস বলে, একজন শিক্ষককেই একসাথে একাধিক ক্লাস নিতে হয়। স্যার এক ক্লাসে লিখতে দিয়ে অন্য ক্লাসে গিয়ে পড়ান। এভাবে কোনমতে ক্লাস চলে। কিন’ ক্লাস পরীৰাগুলো নিতে হিমশিম খান শিৰক। এসব পরীৰা হয় না বললেই চলে।
র্ববাইয়া জান্নাত নামে নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী বলে, অনেক সময় গণিতের শিক্ষককে শারিরীক শিক্ষা ক্লাস নিতে হয়। আবার ধর্মের শিৰক এসে বিজ্ঞানের ক্লাস নেন। এতে আমরা বইয়ের কোনো অধ্যায়ে সমস্যায় পড়লেও সমাধান পাই না। বাধ্য হয়ে কোচিংয়ে যাই। পরীৰার আগে পড়া তো শেষ করতে হবে!
অভিভাবক আর শিৰার্থীদের কোচিং সেন্টারে আগমন উপলৰে প্রতিদিন বিকেলে তিল ধারণের ঠাঁই হারায় রাজশাহী নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকা। গতকাল বিকেলে এ এলাকায় একটি সরকারি স্কুলের দশম শ্রেণির শিৰার্থী সৌরভ শাহরিয়ার বলে, স্কুলে তো অনেক বিষয়ের টিচার নাই। বাধ্য হয়েই কোচিং সেন্টারে পড়তে হচ্ছে। এখানেই ভালো বুঝতে পারি।
রাজশাহীর পিএন সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ১১ জন শিৰক গত বছরের ৫ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন অন্য স্কুলে চলে গেছেন। স্কুলটির প্রভাতি শাখায় ধর্ম, বাংলা ও গণিত এবং দিবা শাখায় ধর্ম, ভৌত বিজ্ঞান, গণিত ও শারীরিক শিৰা বিষয়ের একজন করে শিৰক নেই।
স্কুলটির প্রধান শিৰক তৌহিদ আরা বলেন, দুই শিফটে স্কুলটিতে এক হাজার ৬শ’৪৫ জন শিৰার্থী। শিৰক সঙ্কটের কারণে এতো বিপুল সংখ্যক শিৰার্থীকে পাঠদান করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক বিষয়ের শিৰককে অনুরোধ করে অন্য বিষয়ের ক্লাস করানো হয়। এছাড়া উপায় নেই।  একজন অতিথি শিৰক আসেন, তাও সময় মেপে। অনেক সময় তাকেও পাওয়া যায় না। খুবই সমস্যা।
তৌহিদ আরা বলেন, দশম শ্রেণির শিৰার্থীরা এসে প্রায়ই বলে- ম্যাডাম, অন্য শিৰকের ক্লাসে পড়া বুঝতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য আমি নিজেও অপরাধবোধ করি। কারণ, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা অনেক গুর্বত্বপূর্ণ পাঠ শেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই শূন্য পদ পূরণে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিৰা (মাউশি) অধিদপ্তরকে দুটি চিঠি লিখেছি। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস’া হয়নি।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিৰার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৯৫৩ জন। এই স্কুলেরও পাঁচজন শিৰক পদোন্নতি পেয়ে অন্য স্কুলে চলে গেছেন। গণিত, বাংলা ও ধর্মের শিৰক নেই স্কুলটিতে। রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলে নেই পদার্থ ও রসায়নের শিৰক। রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিৰক। দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিৰক। একই অবস’া জেলার মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিৰা (মাউশি) রাজশাহী অঞ্চলের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরের পাঁচটি সরকারি স্কুল, একটি মাদ্রাসা এবং জেলার উপজেলা পর্যায়ের পাঁচটি সরকারি স্কুলের সবগুলোতেই শিৰক সঙ্কট আছে। কিন’ পুরো জেলা বা বিভাগে ঠিক কতজন শিৰকের পদ শূন্য আছে তার হিসাব মাউশির কাছে নেই। গত বছরের ৯ এপ্রিলের সর্বশেষ হিসাবমতে, রাজশাহী বিভাগের ৩৭টি সরকারি স্কুলে ৭৪ জন শিৰকের পদ শূন্য রয়েছে। তবে বর্তমানে এ সংখ্যা একশোর বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
মাউশির রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরীও ভারপ্রাপ্ত। শিৰক সঙ্কটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষক সঙ্কটে পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে, বিষয়টি আমরাও উপলব্ধি করছি। সমস্যা সমাধানের জন্য বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। খুব শিগগির হয়তো হয়ে যাবে।

Leave a Reply