গ্যাস-পানির সংযোগে ক্ষতবিক্ষত রাস্তা

21/03/2017 1:09 am0 commentsViews: 29

রিমন রহমান: ৰতবিৰত হয়ে উঠেছে রাজশাহী মহানগরীর প্রায় সবগুলো রাস্তা। এক মাইল পথ পেরোতেই ২০-৩০টি ক্ষত পার হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। কোনো কোনো এলাকায় এ সংখ্যা আরো বেশি। গ্যাস ও পানির সংযোগ স’াপনে নগরীর অলিগলির এসব রাস্তা কেটে ৰতবিৰত করা হয়েছে।
রাস্তা কাটার জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) গ্রাহকদের কাছ থেকে ৰতিপূরণের টাকা আদায় করেছে ঠিকই। কিন’ দীর্ঘ দিন ধরে এসব রাস্তার বেশিরভাগই মেরামত করা হয়নি। যেগুলো নামমাত্র মেরামত করা হয়, সেগুলোও আগের অবস’ায় চলে গেছে। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব রাস্তার অবস’া অত্যন্ত নাজুক। একটু পর পর সড়ক আড়াআড়ি করে গ্যাস-পানির সংযোগের গর্ত। এসব গর্ত পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। কোথাও কোথাও সড়ক কাটা গর্তগুলো মেরামত করা হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে কিছু দিন পরই সেগুলো নিচের দিকে দেবে গিয়ে আবার আড়াআড়ি গর্ত হয়ে গেছে। ফলে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে রাস্তাগুলো। এর ওপর দিয়েই চলছে হাজার হাজার রিকশা-অটোরিকশা। চালকেরা বলছেন, অসাবধানতাবশত একটু অসতর্ক হলেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
নগরীর বর্ণালী মোড় থেকে হেতেম খাঁ হয়ে সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর থেকে ভাটাপাড়া হয়ে কোর্ট স্টেশন এবং আলুপট্টি মোড় থেকে বোসপাড়া হয়ে তালাইমারী পর্যন্ত সর্ব রাস্তাগুলোর অবস’া একেবারেই বেহাল। এসব রাস্তার এক কিলোমিটার পথ পার হতেই অন্তত ২০-৩০টি গ্যাস অথবা পানির সংযোগের ক্ষত পার হতে হচ্ছে। এসব গর্ত কমিয়ে দিয়েছে ব্যস্ত নগরীর যানবাহনগুলোর চাকার গতি। তবু বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য গর্ত মাড়িয়ে সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করছে ছোট বড় নানা ধরনের যানবাহন।
এদিকে নগরীর বর্ণালী মোড় থেকে হেতেমখাঁ হয়ে সাহেববাজার পর্যন্ত রাস্তাটিরও প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জায়গায় রয়েছে পানি ও গ্যাস সংযোগের কাটা। যা থেকে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। স’ানীয়রা জানাচ্ছেন, গত প্রায় দু’বছর ধরে সড়কে এসব গর্ত রয়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাস ও পানির সংযোগ স’াপনের পর সঠিকভাবে সংষ্কার না করে শুধুমাত্র ইটের খোয়া ফেলে রাখায় এসব গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর সাগরপাড়া, ছোট বটতলা, বালিয়াপুকুর ও মঠপুকুর এলাকায় গিয়েও দেখা মিলল একই চিত্র। যত্রতত্র সড়ক খুঁড়ে বাসা বাড়িতে গ্যাস ও পানির সংযোগ স’াপনের ফলে এ এলাকাগুলোর রাস্তার প্রতি কিলোমিটারে অন্তত ২০ থেকে ৩০ স’ানে রয়েছে প্রায় ৫ থেকে ১০ ইঞ্চি বরাবর গর্ত। একই অবস’া নগরীর কলাবাগান, ফকিরপাড়া, সরকারিপাড়া, হোসনীগঞ্জ, সিপাইপাড়া ও রামচন্দ্রপুরসহ প্রায় সব এলাকার সড়কগুলোর।
স’ানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তাগুলো সংষ্কারের জন্য তারা স’ানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদেরকে বারবার অনুরোধ করলেও তারা তা আমলে নিচ্ছেন না। ফলে এসব গর্তের ওপর দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস’ হচ্ছে যানবাহন।
মঠপুকুর এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম (৭০) বলেন, রাস্তা সংষ্কার না হওয়ায় এখন রিকশায় উঠতেই ভয় লাগে। রিকশার চাকা যখন এসব গর্তে পড়ে, তখন মনে হয়- কোমর বুঝি এবার গেল! বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুর রউফ বলেন, সড়ক কাটার জন্য রাসিক ৰতিপূরণের টাকা তো ঠিকই নিয়েছ, এখন কাজ হচ্ছে না কেন? টাকা গেল কোথায়? খোঁজ নেয়া দরকার।
গতকাল সোমবার সকালে নগরীর সাহেববাজার এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক জুলমত আলীর (৪৫) সঙ্গে। জুলমত বলছিলেন, গর্তের কারণে অনেক সময় আচমকা ঝাঁকুনিতে রিকশা থেকে যাত্রী ছিটকে পড়ে আহত হন। আবার রিকশায় কোনো অসুস’ রোগী থাকলে তার অবস’া আরো খারাপ হয়ে ওঠে। সড়কের গর্ত পার হতে গিয়ে মাঝে মাঝেই রিকশার নাট-বোল্ট ও সিপ্রং খুলে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে চাকার বিয়ারিংও।
সামাউন আলী (২৫) নামে অপর এক অটোরিকশা চালক বলেন, রাস্তার গর্তগুলো পার হতে বার বার ব্রেক করতে হয়। এতে অটোরিকশার চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। বার বার ব্রেক করলে ১২০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম একটি অটোরিকশা চলে ৯০ থেকে বড়জোর ১০০ কিলোমিটার। ফলে অনেক সময় তাদের চার্জ খরচ তুলতেই সারাদিন চলে যাচ্ছে। এতে তারাও ৰতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর গাড়ির তো ৰতি হচ্ছেই।
সংশিৱষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোনো বাসায় গ্যাস বা পানির সংযোগ স’াপনের আগেই সিটি করপোরেশন থেকে গ্রাহকদের সড়ক কাটার জন্য অনুমতি নিতে হয়। রাস্তা মেরামতের জন্য সিটি করপোরেশন গ্রাহকের কাছ থেকে নির্ধারিত টাকা নিয়ে থাকে। রাজশাহী শহরের কার্পেটিং রাস্তার জন্য প্রতি বর্গমিটারে ৩ হাজার ১৯০ টাকা, ফুটপাতের জন্য এক হাজার ৯৩৯ টাকা, সিসি রাস্তার জন্য এক হাজার ৮২৪ টাকা, হেরিংবন্ডের (ইটের রাস্তা) জন্য ৯৯০ টাকা এবং কাঁচা রাস্তার জন্য ৯৭ টাকা করে ক্ষতিপূরণ নেয় রাসিক। তারপর গ্যাস ও পানির সংযোগের জন্য রাসিকের প্রধান প্রকৌশলী রাস্তা খোঁড়ার অনুমতি দেন।
নগরীতে গ্যাস সংযোগের পাইপ বসানোর জন্যও গ্রাহকের কাছ থেকে ক্ষতিপুরণের টাকা নিয়েছে রাসিক। আবার রাস্তা কেটে পানির সংযোগ স’াপনেও টাকা নেয় রাসিক। কিন’ খোঁড়াখুঁড়ির পর অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও রাস্তাগুলো সংষ্কার করেনি নগর সংস’ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
নগরীর মঠপুকুর এলাকার বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম (৪৫) বলেন, গ্যাস সংযোগ বসাতে রাসিকের রাস্তা কাটার অনুমতি নিয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল তিনি ৰতিপূরণ জমা দিয়েছেন ব্যাংকে। কিন’ এই অনুমতি পেতে হিসাবের টাকার বাইরেও তাকে বাড়তি আরও ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। কিন’ এখন পর্যন্ত তার বাড়ির সামনের রাস্তাটি মেরামত করা হয়নি।
পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৭ জুন থেকে রাজশাহী মহানগরীতে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া শুর্ব হয়। গত বছরের মে মাস পর্যন্ত গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে নগরীর ৯ হাজার ১০৩ জন গ্রাহক তাদের বাড়িতে সংযোগ পান। এসব গ্রাহকের সবাইকে রাসিককে ৰতিপূরণের টাকা দিতে হয়েছে। ৰতিপূরণ দেয়ার রশিদের কাগজ না পাওয়া পর্যন্ত একজন গ্রাহককেও সংযোগ দেয়া হয়নি।
পিজিসিএলের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস’াপক আফম আজাদ কামাল বলেন, গ্রাহক রাস্তা কাটলে রাসিক তার কাছ থেকে ৰতিপূরণ নেয়। মূল লাইনের সম্প্রসারণের সময় তারা আমাদের কাছ থেকেও ৰতিপূরণ নেয়। রাস্তা মেরামতের পুরো দায়িত্ব রাসিকের। কেন মেরামত করা হচ্ছে না তা তারাই ভালো বলতে পারবে।
একই কথা বলছেন পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপৰ (ওয়াসা)। সংস’াটির রাজশাহী কার্যালয়ের ব্যবস’াপনা পরিচালক আজাহার আলী বলেন, গ্রাহক রাস্তা কাটার জন্য রাসিককে ৰতিপূরণ না দিলে আমরা তাকে সংযোগই দিই না। মূল লাইনের সঞ্চালনের সময় আমরা নিজেরাও রাসিককে ৰতিপূরণ দিই। সামনের মাসেই তারা আমাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের একটা অর্থ পাবে। এতো টাকা পেয়েও কেন রাস্তা মেরামত হয় না তা বলতে পারবো না।
রাসিকের একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু গ্যাস সংযোগ দেয়ার সময়ই গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ৰতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। পানির ৰেত্রে ৰতিপূরণ আদায় চলমান রয়েছে। নগরীর কিছু কিছু এলাকায় ঠিকাদারের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে। কিন’ বেশিরভাগ ঠিকাদারকে এখন পর্যন্ত বিল পরিশোধ করতে পারেনি রাসিক। আবার অনেক জায়গায় দরপত্র আহ্বান করেও টাকার অভাবে ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে রাসিকের উন্নয়ন শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী নূর ইসলাম বলেন, যে ৰতিপূরণ আদায় করা হয়, রাস্তা মেরামতে তার চেয়েও বেশি খরচ হয়। এ জন্য সব জায়গার কাজ শেষ করা যায়নি। এতে নগরবাসীর ভোগান্তির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সংস্কারের ব্যাপারটি একটি চলমান কাজ। ধীরে ধীরে সব জায়গারই কাজ শেষ করা হবে।

Leave a Reply


shared on wplocker.com