অনেক দূর যেতে চান সানজামুল

১৫/০৩/২০১৭ ১:০৫ পূর্বাহ্ণ০ commentsViews: 63

রিমন রহমান: দিনটা ঠিক আর বাকিগুলোর মতোই। রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি মোড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন সানজামুল ইসলাম। গত সোমবার রাত তখন ৮টা। হঠাৎ একাত্তর টেলিভিশনের স্পোর্টস রিপোর্টার দেব চৌধুরীর ফোন। বললেন, ‘গুড নিউজ আছে। আপনি ওয়ান ডে টিমে চান্স পেয়েছেন’।
উচ্ছ্বাসিত সানজামুল। এই দিনটার জন্যই তো তিনি অপেৰা করছিলেন। সেই অপেৰা কিশোর বয়স থেকেই। ছোটবেলায় ভাবতেন- কবে বড় হব! বড় হয়ে জাতীয় দলে খেলব। কিন’ শুধু ‘বড়’ হলেই তো হবে না, জাতীয় দলে খেলতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সানজামুল তাই করতেন।
সানজামুল এখন ‘বড়’ হয়েছেন। জাতীয় দলে খেলার সাধও মিটতে যাচ্ছে। জাতীয় দলে খেলে এখন অনেক দূরে যেতে চান সানজামুল। জাতীয় দলে ডাক পেয়ে এসব কথায় জানিয়েছেন উদীয়মান এই ক্রিকেটার। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল এলাকায় সানজামুলদের বাসায় বসেই কথা হয় তার সঙ্গে।
সানজামুল বলছিলেন, ‘জাতীয় দলে খেলাটা তো স্বপ্নের মতো। প্রথম যখন খবরটা শুনলাম, উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠেছিলাম। সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার জীবনের সেরা সময় যেন সেটাই। মুহূর্তটা আমি কখনোই ভুলবো না। আজ বাবা যদি বেঁচে থাকতেন! খবরটা শুনে তিনিও খুশি হতেন’।
জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটাই সব নয়। অনুভূতি ভালো সেটাও বড় কথা নয়। ভালো পারফরমেন্স দিয়ে দলে টিকে থাকাটাই আসল কথা। দলে ডাক পেয়ে সানজামুল বুঝে গেছেন আগামীর কর্তব্যটাও। কেবল ডাক পেয়ে বা জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে থাকলেই হবে না, সেটাকে অনেকদূর টেনে নিয়ে যেতে হবে।
সানজামুলও সেভাবেই ভাবছেন। বলছেন, ‘দলে ডাক পেলেই বা দু’একটি ম্যাচ খেললেই সব পাওয়া হয়ে যাবে না। জাতীয় দলে টিকে থাকতে হলে ভালো কিছু করেই থাকতে হবে। ওয়ান ডে খেলার স্বপ্ন পূরণ করেই আমি থেমে যেতে চাই না। জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়াটারকে অনেক লম্বাই দেখতে চাই আমি।’
প্রতিটি দলে ১৪ জনের মূল স্কোয়াডের বাইরে আরও তিন জন খেলোয়াড়কে তালিকায় রাখা হয়। গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৪ জনের মূল স্কোয়াডের বাইরের তালিকায় ছিলেন সানজামুল। তবে খেলার জন্য ডাক পড়েনি। কিন’ এবার শ্রীলঙ্কার বির্বদ্ধে ওয়ান ডে ক্রিকেটে চমক হয়ে এসেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার। অবশ্য এ খবর তিনি কিছু দিন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।
সানজামুল জানালেন, গত মাসে চট্টগ্রামে বিসিএলের ম্যাচে বিসিবি উত্তরাঞ্চলের হয়ে ওয়ালটনে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে ৮০ রানে ৯ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইনিংস-সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। এরপরই তার পাসপোর্ট নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সানজামুল তখনই কিছু ঠাওর করতে পেরেছিলেন। তারপর বিসিবির নির্বাচক হাবিবুল বাসার সুমন বলেই দিয়েছিলেন- ‘প্রস’ত থাকো। ডাক আসতে পারে’।
ডাক এসেছে। নিজেকে মেলে ধরারও সময় এসেছে। প্রথম শ্রেণির সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে ১০ ম্যাচে ৩৩ উইকেট নিয়ে চতুর্থ স’ানে আছেন সানজামুল। এ ছাড়া ৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার শিকার ২১২ উইকেট। তাই নিজেকে মেলে ধরতে পারার আত্মবিশ্বাসটাও তার দৃঢ়ই।
২৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘শ্রীলঙ্কায় অবশ্যই সবটুকু উজাড় করে দেয়ার চেষ্টা করবো। সামনে বাংলাদেশের আরও কয়েকটি সিরিজ আছে। শ্রীলঙ্কায় ভালো করতে পারলে, সেগুলোতেও ডাক পড়বে। নিজেকে প্রমাণ করেই আমি টিকে থাকতে চাই’।
সানজামুল ইসলামের জন্মস’ান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে। তবে সে বাড়িতে তিনি থাকেন না। ওই বাড়িতে তার বড় ভাই শামিম হোসেন স্ব-পরিবারে থাকেন। রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল এলাকার বাসাটিতে মা শাহিদা পারভীন, আরেক বড় ভাই আব্দুলৱাহিল ওয়াফি রতন ও তার স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে থাকেন সানজামুল। তার ডাকনাম নয়ন। পড়াশোনা, প্র্যাকটিস সব তার রাজশাহী শহরেই। তবে মাঝে মাঝে বাবা মফিজ উদ্দিন নায়েবের কবর জিয়ারত করতে যান গোদাগাড়ী।
সানজামুল জানিয়েছেন, ছোটবেলায় শিরোইল স্কুল মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতেন। ২০০১ সালের দিকে রাজশাহীর লর্ডস ক্রিকেট একাডেমির কোচ মোহাম্মদ আলী তাকে এই মাঠ থেকেই ধরে নিয়ে যান। শুর্ব হয় তার নেটে প্র্যাকটিস। এরপর জেলা অনুর্ধ্ব-১৩ ক্রিকেট দলে জায়গা পেতে প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। অবশ্য এটা তার নিজের ইচ্ছায় না। বন্ধু সৌরভ চৌধুরী তাকে জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলেন।
সানজামুল সেদিন তিনটি বল করেছিলেন। এতেই টিকে যান। জেলায় খেললেন। জিতলেন। অনুর্ধ্ব-১৩ জাতীয় দলের ৩৬ স্কোয়াডে নাম থাকল। এরপর অনুর্ধ্ব-১৫ জাতীয় লিগ খেললেন। অনুর্ধ্ব-১৭ খেলাও হলো। এই দলে বাংলাদেশের হয়ে মালয়েশিয়াও গেলেন। এরপর অনুর্ধ্ব-১৯ দলেও খেলা হলো। পরবর্তীতে খেললেন প্রিমিয়ার লিগ।
এরপর বিসিবির টিমের সঙ্গে ক্যাম্প করেন প্রায় চার বছর। বিপিএলে চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিলৱা ও ঢাকার হয়েও বল হাতে দ্যুতি ছড়িয়েছেন তিনি। এরপর জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন উজ্জ্বল হতে থাকে সানজামুলের। সানজামুল মনে করেন, বিপিএল ও বিসিএলে ভালো পারফরমেন্সের পুরস্কার হিসেবেই জাতীয় দলে ডাক পড়েছে তার। সানজামুল বোলিং করলেও ব্যাট হাতেও খুব খারাপ করেন না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আছে ১ সেঞ্চুরি ও ৫ ফিফটি। ৬০ লিস্ট ‘এ’ ম্যাচেও ফিফটি আছে একটি।
তাই সুযোগ যদি মেলে তখন সামনে চলে আসবে ব্যাটিংয়ের বিষয়টিও। ঘরোয়া ক্রিকেটে যেখানে ব্যাটিং করার সুযোগ পান, জাতীয় দলে সে সুযোগ কম। সেটা মেনেই সানজামুল বলেছেন, ‘জাতীয় দলে খেললে আমার দায়িত্ব থাকবে সাধারণত বল হাতে। ব্যাটিংয়ের দরকার পড়লে আমাকে নিচের দিকে ব্যাটিং করতে হবে। সেটার জন্য আমি প্রস’ত। ভালো করলে ওপরেও আসতে পারি। তবে আপাতত এসব নিয়ে না ভেবে বোলিং নিয়েই মনোনিবেশ করছি। ওটাই আমার আগে।’
শ্রীলঙ্কার বিপৰে বাংলাদেশের একেবারেই নতুন মুখ সানজামুল ইসলাম ছাড়াও রয়েছেন তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, ইমর্বল কায়েস, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, সাব্বির রহমান, মাহমুদউলৱাহ, মোসাদ্দেক হোসেন, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মোস্তাফিজুর রহমান, র্ববেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ, শুভাশিস রায়, শুভাগত হোম ও নুর্বল হাসান। গত সোমবার রাতে বিসিবি এই দল ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ দল এখন শ্রীলঙ্কাতেই আছে। আগামি রোববার সেখানে উড়ে যাবেন সানজামুল। ২৬ ও ২৮ মার্চ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ডাম্বুলায় প্রথম দুটি ওয়ানডে ম্যাচে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। ম্যাচ দুটি শুর্ব হবে বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৩টায়। এরপর ১ এপ্রিল কলম্বোয় সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচে মাঠে নামবে উভয় দল। শেষ ম্যাচটি শুর্ব হবে বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টায়।

Leave a Reply