মিথ্যা কথা ও বর্বরতা রোযাকে সওয়াব শূণ্য করে দেয়

২৫/০৬/২০১৬ ১:০৬ পূর্বাহ্ণ১ commentViews: 9

Romjan Logoআরবীতে একটি প্রবাদ আছে ,‘ আস্‌ সিদকু ইয়ুনজি ওয়াল কিজবু ইয়ুহলিক ’ অর্থাৎ সত্য মুক্তি দেয় আর মিথ্যা ধ্বংস করে। সত্য কথা বলার কারণে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে এবং মিথ্যা বলার কারণে জীবন দিতে হয়েছে এরকম হাজার হাজার ঘটনা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাৰরে লিখিত আছে। মিথ্যা কথা যে শুধু মানুষকে পার্থিব জীবনেই সমূহ বিপদের সম্মুখীন করে তাই নয় বরং মিথ্যা মুমিনের পরকালীন প্রাপ্তিকেও ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে রোযাদারের রোযা মিথ্যা কথা বলা এবং অনর্থক কাজের দর্বন দুর্বল হয়ে যায় এবং সে তার আমলের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন , রাসূলুলৱাহ (স.) বলেছেন : যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং তার উপর ভিত্তি করে কাজ করা আর জাহিলদের মত আচরণ বর্জন করল না তার খাদ্য ও পানীয় বর্জনে ( রাযা রাখাতে )  আলৱাহর কোন প্রয়োজন নেই। ( সহীহ আল-বোখারী : ১৯০৩ . সুনানে ইবনে মাযা : ১৬৮৯ , সুনানে আবু দাউদ : ২৩৬২ , সুনানে তিরমিযী : ৭০৭ ,  মুসনাদে আহমাদ : ৯৮৩৯ , মুসনাদে বাজ্জার : ৮৪২৮ , আস্‌ সুনানুল কাবীর : ৩২৩৩ , সহীহ ইবনে খুজাইমা : ১৯৯৫ )
হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর বাল্যকালের ঘটনা। তিনি যখন বিদ্যার্জনের উদ্দেশ্যে এক বানিজ্যিক কাফেলাপর সাথে বাগদাদ চাচ্ছিলেন , তাঁর মা তাঁর জামার আস্তিনের ভেতর সেলাই করে সামান্য কিছু স্বর্ণমুদ্রা ছেলের খরচের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন। পথিমধ্যে কফেলা দস্যুদের কবলে পড়লে দস্যুরা কাফেলার সবার সমস্ত অর্ত-কড়ি কেড়ে নেয়ার পরে বালক আব্দুল কাদেরকে দস্যুসর্দার জিজ্ঞাসা করল , তোমার কাছে কি আছে ? ওলিকুল শীরমনি বালক আব্দুল কাদের তাঁর প্রবাস জীবনের একমাত্র সম্বল স্বর্ণমুদ্রাগুলো মায়ের সেলাই করে দেয়া গোপন জায়গা থেকে বের করে দিলেন। ডাকাত সর্দার আশ্চার্যাম্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল , তুমি স্বর্ণমুদ্রালোর কথা না বললে আমরা তো জানতে পারতাম না। তুমি বলে দিলে কেন ? হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) মায়ের আজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দস্যু সর্দারকে বললেন , মিথ্যা বলা যে মহাপাপ। এতটুকুন একটি বালকের মিথ্যার মহাপাপ থেকে বাঁচতে নিজের শেষ সম্বলটুকু ডাকাতের হাতে তুলে দেয়ার মত বিরল ঘটনায় অভিভূত হয়ে ডাকাতদের দলনেতা তৎৰনাৎ তার দলবল নিয়ে তওবা করে প্রতিজ্ঞা করল আর অন্যায়-পাপাচার নয় এখন থেকে সত্যই জীবনের একমাত্র চলার পথ।
রোযার অনুশীলন মুমিনের জীবনকে পূর্ণাঙ্গভাবে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা করবার জন্য , বর্বরতা থেকে সভ্যতার শিখরে উত্তরণের জন্য। তাই রোযাদার যেমন মিথ্যাশ্রায়ী হতে পারে না তেমনি রোযাদার অশৱীলভাষী বর্বরের মত আচরণও করতে পারে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুলৱাহ (স.) বলেছেন : রোযা জাহান্নাম থেকে বাঁচবার জন্য ঢাল স্বর্বপ। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখবে , সে পাপাচার করবে না , ক্রোধাম্বিত আচরণ করবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সাথে গন্ডগোল করতে আসে তাহলে সে বলে দেবে , আমি একজন রোযাদার মানুষ। ( সহীহ আল-বোখারী ; ১৯০৪ ,সহীহ মুসলিম : ১১৫১ , সুনানে নাসাঈ : ২২১৭ , আস্‌ সুনানুল কুবরা : ২৫৩৭ , মুসনাদে আহমাদ : ৭৬৯৩ ) হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূলুলৱাহ (স.) বলেছেন : যদি কেউ তার সাথে মারামরি করতে আসে অথবা তাকে থাপপড় মারে তাহলেও সে তার প্রতি উতত্তর করবে না। সে শুধু বলে দেবে আমি একজন রোযাদার। ( আল মুজামুল আওসাত : ৯০৪২ )
রাসূলুলৱাহ (স.) এর জীবনে সমস্ত মানবিক গুণের একত্র ও পূর্ণাঙ্গ সমাবেশ ঘটেছিল। বিশেষ করে সর্বকালীন ইতিহাসের বর্বরতম যুগে আলৱাহর রাসূল তাঁর সততা দিয়েই আলোকিত করে তুলেছিলেন মনুষ্য সমাজটাকে। আর সে কারণেই রাসূলের সমস্ত গুণের উর্ধে তাঁর সততা স’ান করে নিয়েছিল এবং বর্বর আরবরা তাঁকে আল-আমীন বা সত্যবাদি উপাধিতে ভূষিত করেছিল। মহান আলৱাহ মুমিনদেরকে সব সময় সত্যাবলম্বি থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।  যেমন এরশাদ হয়েছে ,‘ হে ঈমানদারগণ ! তোমরা আলৱাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদিদের সাথে থাকো। ( সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯ ) আর কিয়ামতের দিন সত্যবাদিদের সত্যবাদিতাই তাদের মুক্তিকে তরাম্বিাত করবে। এরশাদ হয়েছে : আলৱাহ বলবেন : আজ সত্যবাদিদের সত্যবাদিতাই তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত , যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত ; তারা চিরকাল সেখানে থাকবে। আলৱাহ তাদের উপর সন’ষ্ট। আর এটাই মহা সাফল্য। ( সূরা আল-মায়িদাহ : ১১৯ ) মিথ্যার সয়লাবে ভাসমান পৃথিবীকে মুক্ত করতে সত্যের বানী কোরআন এই রমজানে নাযিল হয়েছিল। মুমিনের হৃদয়কে মিথ্যার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে রমজানে সিয়াম সাধনাকে ফরজ করা হয়েছে। সুতরাং রোযাদারকে তার রোযা এবং ঈমানের সুরৰায় মিথ্যাকে চিরতরে বর্জন করে সত্যকে আঁকড়ে ধরে জীবন যাপন করতে হবে।
লেখক : পেশ ইমাম ও খতীব , রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

Tags:

Leave a Reply