এফএনএস: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আজ দশ বছর একটানা ক্ষমতায় আছি বলেই সবাই শান্তিতে আছে। আমি মানুষের জন্য কাজ করবো। সে চিন্তা নিয়ে কাজ করছি বলেই আমি এগিয়ে যাচ্ছি। এখন প্রত্যেকের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন করেছি। প্রত্যেক জায়গায় আজ উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ৭৩তম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানসহ সপ্তাহব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিভিন্ন অর্জন ও সফলতা তুলে ধরতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘ সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশের ইমেজকে আরো সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছি বলে আমি মনে করি। ছয় দিনের জাতিসংঘ সফরে ১৮টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে আমরা এবার বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেছি। সংবাদ সম্মেলনের শুর্বতেই প্রধানমন্ত্রী সফরে তুলে ধরা বিভিন্ন বিষয় ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সফরকালে অনুষ্ঠিত বৈঠকের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কোনো সাংবাদিক ‘মিথ্যা তথ্য’ না দিলে এ আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, উদ্বিগ্ন তারা বেশি হবে, যারা আমাদের বির্বদ্ধে একটার পর একটা লেখা তৈরি করে আছে। কখন ছাড়বে সেটার অপেক্ষায় আছে তারা। সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। তাদের আপত্তির সুরাহা না করেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে ওই আইন পাস করা হয়। সংবাদপত্রের সম্পাদকদের একটি সংগঠন সম্পাদক পরিষদ ওই আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেছে ওইসব ধারা ‘বাক স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতার পরিপন্থি’। সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকরা ওই আইন সংশোধনের দাবি জানিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা জানাতে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে ওই আইন নিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কারো বির্বদ্ধে কোনো তথ্য কিংবা সংবাদ প্রকাশ করলে তা প্রমাণ করতে হবে। প্রমাণ করতে না পারলে সেই সাংবাদিক কিংবা সংশিৱষ্টদের শাস্তি পেতে হবে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আমার বির্বদ্ধে কত মিথ্যা খবর লেখা হল। পদ্মাসেতু নিয়ে এত মিথ্যা নিউজ হল। যার বির্বদ্ধে লেখা হল, সেটা যদি পরে মিথ্যা হয়, তখন যার বির্বদ্ধে লেখা হল, তার তো যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়, কিন্তু যারা লেখে তারা তো বহাল তবিয়তে থেকে যায়।
নতুন আইনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিভিন্ন অপরাধের বিচারের বিষয়ে বলা ছিল, সেগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অপরাধের বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। বিভিন্ন দেশের আইনও আমরা দেখেছি। অনলাইনে ছিল। অনেক আলোচনাও হয়েছে। এরপর এসে হঠাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে গেলেন, কিসের জন্য? সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, যারা আলোচনায় গিয়েছে, আমি দেখেছি। যারা একটার পর একটা লেখা তৈরি করে আছেৃ. কখন ছাড়বে আমার বির্বদ্ধে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষোদ্গার ও ‘নোংরামির’ বির্বদ্ধে লড়তেও কাজে লাগবে। তিনি বলেন, সাইবার সিকিউরিটি প্রতিটি দেশেই একটি বিরাট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় সামাজিক, পারিবারিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। নানা ধরনের ক্রাইম, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস এবং পর্ন- নানা ধরনের ঘটনা দেখা দিচ্ছে। সেজন্য সকলেই এ ব্যাপারে প্রচ- উদ্বিগ্ন। ক্রিকেটার লিটন দাসের ফেসবুক পেজে পূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী গোষ্ঠীর সামপ্রদায়িক মন্তব্য-গালাগালের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা এ ধরনের কাজ করে তারা বিকৃতমনা। সরকার এ ধরনের উগ্রবাদের বির্বদ্ধেই কাজ করছে।
সমপ্রতি এশিয়া কাপে দার্বণ পারফরম্যান্স করে আসা লিটন দাসকে ফেসবুকে আক্রমণের বিষয়ে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী সুন্দর খেলে এসেছে ছেলেটা। আমাদের পুরো দল ভালো খেলেছে। কিন্তু যারা এ ধরনের (সামপ্রদায়িক আক্রমণ) কাজ করে তারা কিভাবে এটা করে বুঝে আসে না। এরা বিকৃতমনা। এই উগ্রবাদ-মৌলবাদের বির্বদ্ধেই আমাদের সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ‘দুর্নীতির’ বিচার আইনের নিজস্ব গতিতে চলবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ল’ উইল টেক ইটস ওউন কোর্স। আর কিছু বললে তো বলবেন, বেশি বলি। এক সাংবাদিকের প্রশ্নে একথা বলার পাশাপাশি শেখ হাসিনা আরও বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় থেকে বিচারপতি সিনহাকে বিচারাঙ্গনের সর্বোচ্চ পদে নিলেও তিনি তার ‘মান রাখতে’ পারেননি। সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাইবার সিকিউরিটি (নিরাপত্তা) প্রত্যেক দেশে বিরাট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেখানে সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, পর্নো এসব ছড়াচ্ছে। আমরা সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছি।
নিউইয়র্কে ছয় দিনের সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গেও শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি এ সংকট সামাল দিয়ে দূরদর্শী ভূমিকার জন্য নিউইয়র্কে দুটো সম্মাননা পান শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। নিউইয়র্কে সফরের দ্বিতীয় দিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শরণার্থী সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে শেখ হাসিনা এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনটি প্রস্তাব বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। সাধারণ পরিষদে ভাষণের আগে ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব ‘পূর্ণ সমর্থন ও সব ধরনের সহযোগিতার’ প্রতিশ্র্বতি দেন। ঢাকা থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর রওনা হয়ে দুদিন লন্ডনে কাটিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। আর গত সোমবার তিনি দেশে ফেরেন।
জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা জানাতে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনের উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, মন্ত্রিপরিষদবর্গ, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা।