মোহাম্মদ মাসুদ: বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যা একটি সামাজিক জটিল সমস্যা। যিড়-এর তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি বছর ৮০ হাজারের বেশী মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছরে ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। এরমধ্যে রাজশাহী মহানগরীতে ৯ মাসে আত্মহত্যায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঝুঁকির প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা। এছাড়াও অশিক্ষিত নারী, আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক অবস্থা ও বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ-এর কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকে। এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়ায় অকালে মৃত্যুর হার কমেছে।
শহরের থেকে গ্রামে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭ গুণ বেশী। ২০১৮ সালের (চলতি বছর) জানুয়ারী মাস হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আরএমপি’র সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১৩৩ টি। এরমধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে ৬০টি। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ওয়াল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের এক জরিপের তথ্য মতে, সাধারণত ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে এ ঘটনা বেশী ঘটে। ২০১৬ সালে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ৭৯% আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
গবেষকদের মতে, আত্মহত্যার নিখুঁত কোন কারণ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে এর ঝুঁকির প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের মানসিক অসুস্থতা। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে রোগীকে ২৪ ঘন্টা পর হাসপাতালে আনা হয়। এরআগে ঝাড়ফুক, স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ, ফার্মেসি ও গ্রাম্য ডাক্তারের চিকিৎসা দেয়ার পর শেষ মুহুর্তে হাসপাতালে আনা হয়। এ কারণে ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৯০% আত্মহত্যার শিকার ব্যক্তিদের অন্তত একটি মানসিক ব্যাধির লক্ষণ দেখা গেছে। তবে এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
২০১৮ সালের ২৭ মার্চ অনলাইন প্রকাশিত একটি সংবাদ মাধ্যম ঢাকা পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার হার বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় ১১,০৯৫ জন আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এর উপর কোন সমীক্ষা বা ঝুঁকির কারণ পর্যালোচনা, জাতীয় আত্মহত্যা রোধ কৌশল বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ বাংলাদেশে আছে বলে জানা যায়নি।
এদিকে, ওয়াল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (যিড়) এর তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতিবছর আত্মহত্যায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেণ্টাল হেলথ (এসআইএমএইচ)-এর মতে, দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, চাকুরির নামে বিদেশে অবৈধভাবে নারী পাচার, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল, পারিবারিক সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, প্রেমে ব্যর্থতা, মাদকাসক্তি, পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস, অবিবাহিত অবস্থায় গর্ভবতি, হতাশা, সম্পদ হারানো, অথনৈতিক সংকট, দারিদ্রতা, জীবনের প্রতি ঘৃণা, পরিবারের মধ্যে ভাঙন, বিধবা (স্বামীর মৃত্যু) হওয়া, সহকামী, বাড়িতে বন্দুক থাকা, সমপ্রতি কারাগার হতে মুক্তি পেয়েছে ইত্যাদি। তবে মানসিক অসুস্থতা উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে ফাঁস দিয়ে ও বিষা পানে ৪০ বছরের কম বয়সী নারীর মৃত্যুর সংখ্যায় বেশী। এ ক্ষেত্রে স্বামীদের আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। আত্মহত্যার অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে হচ্ছে, ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেয়া, বিভিন্ন উচ্চতা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা।
আত্মহত্যার ঘটনা যে কোন বয়সে হতে পারে তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বিবাহিত এবং ৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এ ঘটনা বেশী দেখা যায়।
এমবিবিএস, এমবিএ, এমপিএইচ, এমডি (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) আবাসিক এস,এম, ইয়াসির আরাফাত সুইসাইড ইন বাংলাদেশ এ মিনি রিভিউ (অনলাইনে)-এ তাঁর একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর আত্মহত্যায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। গত জানুয়ারী ২০০০ থেকে ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে গড় আত্মহত্যার হার ছিল ৩৯.৬।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদাহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা সব থেকে বেশী।
বর্তমানের উপর ভিত্তি করে ডাব্লুএসপিডি অনুমান মতে, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১.৫৩ মিলিয়ন মানুষ আত্মহত্যায় মারা যাবে। এছাড়াও ১০ থেকে ২০ গুন বেশী মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করবে। অথ্যাৎ প্রতি সেকেণ্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করবে। ডঃ আরাফাত আরো লিখেছেন, এ বিষয়ে দেশে ব্যাপক পর্যালোচনা, আত্মহত্যার বিষয়ে গবেষণা এবং সে অনুযায়ী সমস্যার মোকাবেলা করা প্রয়োজন।