রিমন রহমান: দুই মাসে ছয় খুন। সবগুলো খুনই একই কায়দায়। যারা খুন হয়েছেন তাদের পাঁচজনই ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চালক। একজন চালাতেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। পুলিশ তাদের হাত-পা বাঁধা মরদেহ পেয়েছে। কিন’ ঘটনাস’লে পাওয়া যায়নি নিহত ব্যক্তিদের ভ্যান ও অটোরিকশা। পুলিশ বলছে, শুধু অটোরিকশা আর ভ্যান ছিনতাই করার জন্যই এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহী আর নাটোরে এমনই এক দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের টার্গেট শুধু ভ্যান চালকরা। সামান্য একটি ভ্যানের জন্য তারা একের পর এক খুন করে যাচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলারৰা বাহিনী। খুনি ছিনতাইকারীদের কয়েকজন আইনের আওতায় এলেও বেশিরভাগেরই নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ভ্যান চালকরা।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার চকপলাশী গ্রামের একটি কলাবাগান থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন (৩৫) নামে এক ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহাঙ্গীরের বাড়ি পুঠিয়া পৌর এলাকার গ-গোহালি মহলৱায়। এর একমাস পর গত ৪ অক্টোবর পুঠিয়া থানার শেষপ্রান্ত নাটোর সোনারপাড়া বিলের চার মাথার মোড় সংলগ্ন এলাকা থেকে আবদুল মজিদ (৫০) নামে আরেক ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মজিদের বাড়ি উপজেলার মধুপুর গ্রামে। এ দুটি খুনের ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে পুঠিয়া থানায় মামলা হয়েছে। তবে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
এ নিয়ে জানতে চাইলে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, নাটোরে পর পর এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আমরা মনে করছি, গ্রেপ্তারকৃতদের সঙ্গে পুঠিয়ার দুই খুনের ঘটনায় জড়িতদের যোগসূত্র আছে। তাই গ্রেপ্তারের পর আমরা নাটোরে গিয়েছিলাম। নাটোরে গ্রেপ্তারকৃতদের আমরা পুঠিয়ার দুই খুনের মামলায় আসামি করব। তবে এ পর্যন্ত আমরা নিজেদের তদন্তে কিছু বের করতে পারিনি বা গ্রেপ্তারও করতে পারিনি।
পুঠিয়ায় জাহাঙ্গীরের মরদেহ উদ্ধারের পরদিনই ৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম-কালিগঞ্জ সড়কের পাশের একটি ফসলি জমি থেকে বর্বন কান্ত (৩৮) নামের এক ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত বর্বন উপজেলার ছাতারদিঘী ইউনিয়নের সোরমুজা গ্রামে বাসিন্দা ছিলেন। হাত-পা বেঁধে বর্বনকে খুন করা হয়। তার শরীরেও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
সিংড়া থানার ওসি মনির্বল ইসলাম বলেন, বর্বন খুনের ঘটনায় আমরা তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তারা স্বীকার করেছেন যে শুধু ভ্যান ছিনতাইয়ের জন্য তাকে খুন করা হয়। পরে আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নিহত বর্বনের ভ্যানটি উদ্ধার করেছি। এ মামলার তদন্ত বেশ এগিয়েছে।
এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার শালাইনগর এলাকা থেকে প্রান্ত (১৬) নামে আরও এক কিশোর ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত প্রান্ত রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানি বেড়েরবাড়ি গ্রামের জিয়া উদ্দিনের ছেলে। নিহত প্রান্তর লুঙ্গি ছিঁড়ে হাত-পা, চোখ ও মুখ বাঁধা ছিল। শরীরের বিভিন্ন স’ানে ছিল আঘাতের চিহ্ন।
বাগাতিপাড়া থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, প্রান্ত খুনের ঘটনায় আমরা শরীফ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বাগাতিপাড়ার বেগুনিয়া গ্রামে শরীফের বাড়ি। তিনি হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। শরীফ আরও চারজনের নাম জানিয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া শরীফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাঘা থেকে নিহত প্রান্তর ভ্যানটি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুঠিয়ার ভ্যান চালক আবদুল মজিদের মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন পর গত ২ অক্টোবর নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার শাখারিপাড়া গ্রামের একটি কলা বাগান থেকে হাত, পা ও মুখ বাঁধা অবস’ায় দুলাল চন্দ্র প্রামানিক (৪০) নামের আরও এক ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দুলাল উপজেলার পুর্ব মাধনগর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। দুলালকেও মেরে তার ভ্যান নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
নলডাঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) উজ্জল হোসেন বলেন, দুলাল খুনের ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় মামলা হয়। আমরা সুলতান মাহমুদ মিঠু নামে সন্দেহজনক একজনকে আটক করেছি। কিন’ তিনি স্বীকারোক্তি দেননি। তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে। সুলতানের বাড়ি নলডাঙ্গার হাপানিয়া গ্রামে।
সর্বশেষ গত রোববার সকালে নাটোর সদর উপজেলার বারোঘরিয়া গ্রামের একটি ধানৰেত থেকে ইউসুফ আলী (৪০) নামে এক অটোরিকশা চালকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ইউসুফ আলী নাটোর শহরের দৰিণ বড়গাছা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এই খুনের ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হয়নি কেউ।
নাটোর সদর থানার ওসি কাজী জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্বৃত্তরা ইউসুফ আলীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে তার অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আবদুল খালেক থানায় মামলা করেছেন। মামলায় কারও নাম উলেৱখ করা হয়নি। তবে আমরা বুঝতে পারছি এটা ছিনতাইকারী চক্রের কাজ। আমরা তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সাম্প্রতিক সময়ে নাটোরে ভ্যান চালকদের খুন করে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেলেও এটি নতুন নয়। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই সদর উপজেলার ভাতুরিয়া গ্রামের একটি পুুকুর থেকে শাহাবুদ্দিন (২৫) নামে এক ভ্যান চালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার ভ্যানটিও ছিনতাই করা হয়েছিল। নিখোঁজের দুই দিন পর পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।
এরও আগে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল খুন হন নলডাঙ্গা উপজেলার এক ভুটভুটি চালক। ছিনতাইকারীরা তাকে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বাড়পাকিয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এরপর তার ভুটভুটিটি ছিনতাই করা হয়। এ ঘটনায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাইফুল ও বাবু নামের দুই ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেন নাটোরের আদালত। তারপরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছেই।
একই কায়দায় একের পর এক এসব খুনের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) বিপৱব বিজয় তালুকদার বলেন, খুনগুলো একাধিক ছিনতাইকারী চক্র করছে। ভ্যান চালকেরাই তাদের টার্গেট। সামান্য ভ্যানের জন্য চালকদের এভাবে প্রাণ দিতে হচ্ছে। রাজশাহী-নাটোর-কুষ্টিয়া এলাকায় ছিনতাইকারীদের এমন বেশকিছু চক্র সক্রিয়। এরই মধ্যে আমরা তিনটি গ্র্বপকে শনাক্ত করেছি। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বাকিদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।