স্টাফ রিপোর্টার: মোজাহার হোসেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি একটি প্রতারণার মামলারও আসামি। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ঝালুকা ইউপির এই চেয়ারম্যানের বির্বদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে। তাই গতকাল শনিবার ভোররাতে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মোতালেব তাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। কিন’ সকালেই জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহীদুলৱাহ তাকে ছেড়ে দিয়েছেন।
এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চেয়ারম্যানকে ছেড়ে দেওয়ার পর ওসি মোতালেব এখন বলছেন, চেয়ারম্যানের বির্বদ্ধে কোনো মামলা নেই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও নেই। তবে চেয়ারম্যান মোজাহার জানিয়েছেন, তার বির্বদ্ধে মামলাও আছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে। আর গ্রেপ্তারের আগে ওসি তার কাছে টাকা দাবি করেছিলেন। কিন’ ‘নৌকার মাঝি’ বলে এসপি তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। আজ রোববার তিনি আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইবেন।
মামলাটির বাদীর নাম আব্দুল মজিদ। দুর্গাপুরের হাড়িয়াপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। তিনি বলেন, প্রায় তিন মাস আগে চেয়ারম্যানের বির্বদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করেন। আদালত তার বির্বদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেপ্তার করার পর আদালতে হাজির না করে আসামিকে পুলিশ কীভাবে ছেড়ে দিতে পারে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। আব্দুল মজিদ বলেন, চেয়ারম্যান প্রভাবশালী মানুষ। তাই হয়তো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমি সাধারণ মানুষ। কী করব!
মামলার বাদী জানান, চেয়ারম্যান মোজাহার হোসেন উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি নিজেও আওয়ামী লীগ করেন। তাই চেয়ারম্যানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। গত বছর তিনি চেয়ারম্যানের নিজের চৌপুকুরিয়া গ্রামেই তার একটি জমি তিন বছরের জন্য ইজারা নেন। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় পেয়ারা চাষের জন্য জমিটি ইজারা নেওয়া হয়েছিল। আবদুল মজিদ শুর্বতেই চেয়াম্যানকে দেড় লাখ টাকা দেন। এরপর এক বছরের মধ্যে বাকি টাকা পরিশোধ করেন। এই টাকা পরিশোধের পরও চেয়ারম্যান তার জমি দখল করে নেন।
আবদুল মজিদ বলেন, তিন বছরের আগে চেয়ারম্যান মোজাহার হোসেন বা তার পরিবারের সদস্যরা যদি জমি দখল করতে যান তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন কথা চুক্তিপত্রে লেখা আছে। কিন’ দেড় বছর পরই চেয়ারম্যান ৰমতার দাপটে আমার পাহারাদারকে মারধর করে জমি থেকে তাড়িয়ে দেন। পেয়ারা গাছ কেটে ফেলেন। তাই আদালতে মামলা করেছিলাম। গত ৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় চেয়ারম্যানের বির্বদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।
চেয়ারম্যান মোজাহার হোসেন বলেন, মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। কবে কবে ওয়ারেন্ট হয়ে গেছে। রাত আড়াইটার সময় বাড়িতে পুলিশ আসলো। ওসি মোতালেব আমাকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখালেন। দেখলাম, নাম-ঠিকানা সবই ঠিক আছে। আমি বললাম, আপনাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। থানায় নিয়েন না। রোববারই জামিন নিয়ে থানায় রিকল জমা দিব। ওসি তখন ৫০ হাজার টাকা চাইলেন। আমার স্ত্রী রাজি হলো না। তখন ওসি ৩০ হাজার টাকা চাইলেন। পরে ২০ হাজার চাইলেন। আমরা বললাম, টাকা দিতে পারব না। কোর্ট থেকেই জামিন নিব। তখন সাড়ে ৩টার দিকে আমাকে বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো।
চেয়ারম্যান বলেন, থানায় নেওয়ার পর ওসিকে বললাম, আমাকে তাড়াতাড়ি কোর্টে পাঠান। বেশি দেরি করলে আমার লোকজন থানায় আসবে। তখন সমস্যা হবে। ওসি আমাকে মাইক্রোবাস ডাকতে বললেন। আমি মাইক্রোবাস ডেকে পাঠালাম। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমাকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হলো। কিন’ তখন কোর্ট না খোলায় আমাকে পুলিশ লাইনে নিয়ে রাখা হলো। কিছুৰণ পর ওসি এসে বললেন, চেয়ারম্যান সাহেব টেনশন করবেন না। এসপি স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস’া হচ্ছে। এরপর আমাকে এসপি অফিসে নিয়ে যাওয়া হলো।
চেয়ারম্যানের কথা অনুযায়ী, এসপি প্রথমেই জানতে চান, তিনি কোন দল করেন। চেয়ারম্যান জানান যে, তিনি দীর্ঘ ২৪ বছর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন উপজেলা কমিটির অর্থ সম্পাদক। নৌকা প্রতীক নিয়েই তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর এসপি সাহেব ওসিকে কিছু কথা বলেন। তারপর আদালতে হাজির না করে এসপির কার্যালয় থেকেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে এসব কথা অস্বীকার করে দুর্গাপুর থানার ওসি আবদুল মোতালেব বলেন, এসপি স্যার চেয়ারম্যান মোজাহারকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছিলেন। এজন্য তাকে এসপি স্যারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চেয়ারম্যান নিজেই থানায় এসেছিলেন, নাকি বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছিল জানতে চাইলে ওসি বলেন, বাড়ি থেকেই আনা হয়েছিল। এ সময় চেয়ারম্যানের কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন ওসি। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের বির্বদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই। তার বির্বদ্ধে কোনো মামলা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
চেয়ারম্যানকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি মো. শহীদুলৱাহ বলেন, চেয়ারম্যানকে কেউ ধরে আনেনি। তিনি নিজেই সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টার দিকে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। চেয়ারম্যানের আশঙ্কা, তার বির্বদ্ধে কোনো মামলা থাকতে পারে। কিন’ আমি এ রকম কিছু পেলাম না। তার বির্বদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না সেটাও জানি না। তাই তিনি চলে গেছেন।
চুরির অপরাধে দুই স্কুলছাত্রকে বেঁধে পেটানোর অভিযোগে চেয়ারম্যান মোজাহার হোসেনের বির্বদ্ধে গত বছরও একটি মামলা হয়। এ মামলায় তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করেছিলেন। চেয়ারম্যান জানান, প্রতারণার এই মামলাটিতেও আজ রোববার তিনি আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইবেন।