এফএনএস: চলতি রবি মৌসুম শুর্ব হচ্ছে গম, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজির বর্ধিত আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। একই সময়ে বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুর্ব হচ্ছে বোরো ধানের আবাদও। ফলে আসন্ন রবি মৌসুমে সেচের চাহিদা বেশি থাকবে। বাংলাদেশ পলৱী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) চলতি বছর পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৯২টি সেচ পাম্পে সেচ সংযোগ দিয়েছে। আর আসন্ন সেচ মৌসুমের জন্য নতুন চাহিদা পাওয়া গেছে আরো ১৫ হাজার। পাশাপাশি কিন’ একই সময়ে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা ও রোজা পড়ে যাওয়ায় লোড ব্যবস’াপনা নিয়ে বিআরইবি বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিআরইবি সংশিৱষ্ট সূত্র এসব তথ্য সূত্রে জানা যায়।
সংশিৱষ্ট সূত্র মতে, বোরো মৌসুমে দেশে ধান আবাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সেচের প্রয়োজন পড়ে। তার বাইরে গম ও ভুট্টা চাষের জন্যও সেচের দরকার হয়। পাশাপাশি ওই সময় বিআরইবির সাধারণ গ্রাহকদেরও বিদ্যুৎ চাহিদাও বেশি থাকবে। কারণ ওই সেচ মৌসুম চলাকালেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা। আবার আগামী বছর রোজার মাসও পড়বে এই সেচ মৌসুমের শেষদিকে। সব মিলিয়ে ওই সময় বিদ্যমান ও নতুন সংযোগগুলোয় চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে বিআরইবির লোড ব্যবস’াপনায় ব্যাপক চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের জন্য ইতিমধ্যে পলৱী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর (পবিস) উদ্দেশে নির্দেশনা জারি করেছে বিআরইবির প্রধান কার্যালয়। ওই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সেচে পানি সাশ্রয়ের জন্য সঠিক মানের ক্যাপাসিটর স’াপন, সেচে অফপিক আওয়ারে (রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত) বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে প্রচার চালানো, পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৬টা-রাত ১১টা পর্যন-) কোনো ধরনের হিটার, ওভেন, ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডিং মেশিন, ইস্ত্রির দোকান, পানির পাম্প ইত্যাদি চালানো বন্ধ রাখতে প্রচার চালানো এবং সেচ পাম্পগুলোয় রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অফপিক আওয়ারে সবগুলো সেচ পাম্প চালু রাখার বিষয়ে গ্রাহককে উৎসাহিত করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে সেচ মৌসুমে সেচ পাম্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি তদারকির জন্য জোনাল ও সাব-জোনাল অফিসগুলোকে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছে বিআরইবি সদর দপ্তর।
সূত্র জানায়, বিগত ২০১৪ সালে বিআরইবির সেচ পাম্প সংযোগের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৭৫টি। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২৬টিতে। তার পর ২০১৬ সালে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৩২টিতে। তবে ২০১৭ সালে ওই সংযোগ সংখ্যা নেমে আসে ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪৫টিতে। তারপর চলতি বছর বিআরইবির সেচ সংযোগের সংখ্যা আবারো বেড়ে গিয়ে উন্নীত হয় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৯২টিতে। আগামী বছর তার সঙ্গে অতিরিক্ত আরো ১৫ হাজার সংযোগ দিতে চাইছে বিআরইবি। নতুন এসব সেচ সংযোগ আবেদনের মধ্যে অধিকাংশই রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে এসেছে। সেচ সংযোগগুলোর চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতি বছরই দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস’ার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ভরা মৌসুমে সেচের জন্য প্রতিদিন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। সেচ সংযোগের জন্য কৃষকরা বিআরইবি ছাড়াও ওজোপাডিকো, পিডিবি, ডেসকো ও ডিপিডিসির কাছেও আবেদন করে থাকে।
সূত্র আরো জানায়, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩৫-৩৭ ঘনকিলোমিটার পানি উত্তোলন করা হয়। ওসব উত্তোলিত পানির ৮৮ শতাংশই ব্যয় হয় কৃষি সেচ ও প্রাণী সম্পদ খাতে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত ভূগর্ভস’ পানির উপরেই বেশি নির্ভরশীল। সেখান থেকেই পানির মোট চাহিদার ৭৯ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। আর এভাবে ভূগর্ভস’ পানি ব্যবহার করতে গিয়ে পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার তার মধ্যে বড় একটি অংশ এখন অপচয়ও হচ্ছে। বাংলাদেশে সেচের জন্য তোলা পানির মধ্যে কাজে লাগে মাত্র ৩৮ শতাংশ। বাকি ৬২ শতাংশই অপচয় হয়।
এদিকে সেচের পানির অপচয় রোধে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বর্তমানে দেশে সেচ ব্যবস’ার দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হকের মতে, নতুন সেচ সংযোগসহ পুরনো সেচ সংযোগগুলোয় সেচ দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। সেজন্য সেচ যন্ত্র ও নালাগুলোকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। সেজন্য বারিড বা এডবিৱউডি পাইপ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পানির অপচয় কমানোর জন্য সারফেস সেচ নালা নির্মাণ, পুরনো ডিপ টিউবওয়েলগুলোর পুনর্বাসন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। আর ভূ-উপরিভাগস’ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে গুর্বত্ব দিয়ে এখন অধিক পরিমাণে খাল-নালা খনন ও পুনঃখনন করা হচ্ছে। সঠিক পরিমাণ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস’ পানির স্তর অবনমন রোধ করতে সেচ দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। খুব দ্র্বত সেচ দক্ষতা ৪৮ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
অন্যদিকে এবিষয়ে বিআরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) জানান, সেচ বিপৱবের কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। অধিক ফসল উৎপাদন ও বিপুল কর্মসংস’ানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য উলেৱখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করতে বিআরইবি বিদ্যুৎ সংযোগকে গুর্বত্ব দিয়ে থাকে। সেজন্য নতুন যে ১৫ হাজারের মতো আবেদন এসেছে, সেগুলোকে যাচাই-বাছাই করে দ্র্বত সংযোগ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। লোড ব্যবস’াপনার জন্য সেচ পাম্পগুলোয় রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কৃষকের চাহিদাকে গুর্বত্ব দিয়ে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার।