সোনালী ডেস্ক: আগ্নেয়াস্ত্রের ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগে ৪১৭ জনের বির্বদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ভুয়া লাইসেন্স গ্রহণকারী ৩৮৯ জন, বাকি ২৮ জন জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়ায় সহায়তা করেছেন। ভুয়া লাইসেন্স গ্রহণকারী ৩৮৯ জনের মধ্যে বৃহত্তর রাজশাহীর ২১ জন রয়েছেন। দুদকের মামলায় তারাও ফাঁসছেন।
এরা হলেন- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নূর্বল ইসলাম, তজির্বল ইসলাম, শিবগঞ্জের কামির্বল হক, নওগাঁ সদরের মো. আকতার্বজ্জামান, বিষ্ণু চৌহান, মোহসিন আলী, মহাদেবপুরের আবদুর রাজ্জাক, ধামইরহাটের শাহিনুর আলম, মেহেদী হাসান, আত্রাইয়ের আবদুর রাজ্জাক সরদার, সান্তাহারের রফিকুল ইসলাম, মান্দার রেজাউন নবী, মোশাররফ হোসেন, শহিদুল ইসলাম, রাজশাহীর চারঘাটের আবুল হোসেন, মোবারক আলী খন্দকার, বিপৱব হোসেন, নাটোরের সিংড়ার আল-মামুন, বিপৱবুর রহমান, বড়াইগ্রামের রফিকুল ইসলাম ও বাগাতিপাড়ার আবদুল আওয়াল শেখ।
সূত্র জানায়, একটি দালাল চক্র তৎকালীন রংপুর জেলা প্রশাসকের স্বাৰর জাল করে ২০১৪ সাল ও গত বছরের মে পর্যন্ত ৩৮৯টি অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছে। গত বছরের মে মাসে ফাঁস হয় এই জালিয়াতির ঘটনা। ওই সময়ের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একজন সহকারী ও একজন দালালের বির্বদ্ধে মামলা করা হয় রংপুর কোতয়ালী থানায়। অপরাধটি দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় গত এক বছরের বেশি সময় কমিশনের রংপুর অফিস থেকে তদন্ত করা হয়েছে মামলাটি।
দীর্ঘ তদন্তে সারাদেশের ৩৮৯ জন ব্যক্তির জাল লাইসেন্সের সব ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই সময়ে জব্দকৃত ৩৫৪টি অস্ত্র ও প্রায় সাড়ে চার হাজার রাউন্ড গুলি রংপুর জেলা আদালতের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষে আসামির তালিকায় ৪১৭ জন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। দুদকের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয় থেকে কমিশনের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। শিগগির সংশ্নিষ্ট শাখা থেকে কমিশনে পেশ করা হবে প্রতিবেদনটি। সেটি যাচাই করে চার্জশিটের অনুমতি দেবে কমিশন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, জেলা প্রশাসকের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাঁর স্বাৰর জাল করেছে একটি প্রতারক চক্র। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তারা গোপনে দেশের বিভিন্ন স্থানের ৩৮৯ জনকে আগ্নেয়াস্ত্রের জাল লাইসেন্স দিয়েছে। এ ৰেত্রে যারা লাইসেন্স দিয়েছেন ও লাইসেন্স নিয়েছেন- উভয়ই অপরাধী। তদন্তে তাদের অপরাধের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের জাল লাইসেন্সে অস্ত্র কেনা দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির জন্যও হুমকিস্বরূপ। কমিশন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের আইনের কাছে সোপর্দ করবে।
এদিকে জাল লাইসেন্স গ্রহণকারীরা জানান, বৈধ জেনেই তারা লাইসেন্স নিয়েছেন। প্রকৃত ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর তারা জানতে পেরেছেন-তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে ডিসির স্বাৰর জাল করে লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, দুদক অস্ত্র জব্দের কাজ শুর্ব করে গত বছরের আগষ্ট থেকে। গত এক বছরে ৩৫৪ জনের অস্ত্র ও গুলি জব্দ করা হয়। জাল লাইসেন্স গ্রহণকারীদের সিংহভাগই সেনা, নৌ, পুলিশ, বিডিআর ও আনসার বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। এর বাইরে স্বল্পসংখ্যক সাধারণ মানুষ ওই লাইসেন্স নিয়েছেন। অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে শর্টগান ও একনলা বন্দুক।
দুদক সূত্র জানায়, আইন-শৃংখলা রৰাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, সার্জেন্ট, করপোরালসহ অন্যান্য পদের ব্যক্তিদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রয়েছে ২০১২ সাল থেকে। এ ৰেত্রে চালাকি করে ১৯৮৬ থেকে ২০০৯ সাল উলেৱখ করে লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছে মূলত ২০১৪ সাল ও ২০১৭ সালের মে পর্যন্ত। চাকরিকালীন সময়ে সরকারের সেনা, পুলিশসহ সব বাহিনীর প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণ করতে পারেন। ওই সময়কালীন তাদের অধস্তনদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার ৰেত্রে বাঁধা রয়েছে। এ কারণে অবসরে যাওয়ার পর অবৈধভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার ওই পথ বেছে নিয়েছিলেন তারা।
জানা গেছে, রংপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) স্বাৰর জাল করে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৮ মে ডিসি অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমূল্য চন্দ্র রায় বাদি হয়ে মামলাটি করেন। একই অফিসের ওই সময়ের অফিস সহকারি শামসুল ইসলামকে আসামি করে রংপুর কোতয়ালী থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন তিনি। মামলা দায়েরের দিনেই গ্রেফতার করা হয় শামসুল ইসলামকে। পরে একই অপরাধে দালাল আবদুল মজিদকে গ্রেফতার করা হয়। উভয়ই জেলে রয়েছেন বর্তমানে।
দীর্ঘ সময়ে মামলাটি তদন্ত করেছেন দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক আতিকুর রহমান। তদন্ত কার্যক্রম তদারক করেছেন উপ-পরিচালক মোজাহার আলী সরদার। জালিয়াত চক্রের হোতা শামসুল ইসলাম অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, শামসুল ইসলাম ও আবদুল মজিদ অবৈধ অর্থের বিনিময়ে বৈধ আবেদন ছাড়া বেআইনীভাবে ভুয়া লাইসেন্সগুলো প্রদান করেছেন। অবৈধ আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। অবৈধভাবে একেকটি লাইসেন্স নেওয়া ৰেত্রে সংশ্নিষ্টদের খরচ হয়েছে ৪-৫ লাখ টাকা। অস্ত্রের দশটি দোকান থেকে কেনা হয় ৩৫৪টি অস্ত্র। প্রয়োজনীয় নথিপত্রও জব্দ করা হয়েছে ওইসব দোকানের।