মোহাম্মদ মাসুদ: খাদ্যজাতীয় রোগে বিশ্বে প্রতিবছর ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে ৫ বছরের কম শিশু মৃত্যুর সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ। এই তথ্য বিশ্ব স্বাস’্য সংস’ার (ডাবৱুএইচও)। এছাড়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের জরিপে জানা গেছে, জ্বর, সর্দি বা কাশিতে রাজশাহীতে ১৩০০ রোগীর মধ্যে ৩৪৭ জন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন।
প্রয়োজন ছাড়া জীবন রৰাকারী এই ওষুধ ব্যবহার মানুষের স্বাসে’্যর জন্য মারাত্মক ৰতিকারক। ওষুধ মানেই তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। সেটি মাথা ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, পেপটিক আলসারের জন্য রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল বা অ্যান্টিবায়োটিক যাই হোক। অথচ সারাদেশে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অবাধে ওষুধ বিক্রি করা হয়। মানুষ বা প্রাণীর ৰেত্রে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সংক্রমণগুলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক হয়ে ওঠে। এতে করে ভবিষ্যতে সাধারণ রোগও জটিল হয়ে উঠবে এবং চিকিৎসা ব্যবস’া হবে ব্যয়বহুল। উক্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা দেশের দরিদ্র মানুষের পৰে সম্ভব হবে না। কিন’ এ ব্যাপারে ডাক্তার, ক্রেতা ও ওষুধ বিক্রেতা সকলেই উদাসিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষ, খামারের পালিত প্রাণী, ও কৃষির ৰেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সব চেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয় কৃষিতে। অবিলম্বে সচেতন না হলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা আইন থাকলেও তার প্রয়োগ খুব সীমিত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ বিভাগের চেয়ারম্যান ডাঃ আব্দুর রহিম ডাবৱুএইচওতে তার দেয়া সাৰাৎকারে বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি হয় না। কিন’ বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই দেদারসে এই ওষুধ বিক্রি হয়।
রাবি সুত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের মার্চ হতে এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় ১৩০০ রোগীর মধ্যে এক জরীপ করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের মাস্টার্স-এর ২৬ জন শিৰার্থী এই স্বাস’্য জরিপে অংশ গ্রহণ করেন।
জরিপে দেখা যায়, ১৩০০ রোগীর মধ্যে ৩৪৭ জন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এরমধ্যে পূর্বষ ৮৩.৫৭% এবং নারী ১৬.৪৩%। অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ঠা-া, কাশি, জ্বর, সংক্রমণ, দাঁতের ব্যাথা, পেটের অসুখ, গলা ব্যথা, হাঁপানি রোগের জন্য ব্যবহার করা হয়। বেশীর ভাগ ৰেত্রে ৪০.৬৩% রোগী ২ বছর ধরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন, ৫ থেকে ৬ বছর ১৯.৮৮%, ৭ থেকে ৮ বছর ১৪.৪১%, ৯ থেকে ১০ বছর ধরে ১১.৮২% রোগী এই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন। যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া ডাবৱুএইচও এর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায়ই জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়াজনিত অসুস’তায় আক্রান্ত হয় মানুষ। এ সকল অসুখের ৰেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোন কার্যকারিতা নেই। ডায়রিয়া স্বাভাবিক নিয়মে দুই বা তিনদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। পানি শূণ্যতা না হয় সে কারণে শুধুমাত্র খাবার স্যালাইন খেতে হয়। কিন’ এ ধরনের কোন রোগ দেখা দিলে রোগী সরাসরি চলে যান কোন (ফার্মেসি) ওষুধ বিক্রেতার কাছে। আর ওষুধ বিক্রেতা অ্যান্টিবায়োটিক গছিয়ে দেন ক্রেতার হাতে। আবার কোন আঘাত বা ব্যথা পেলে রোগী একইভাবে একগাদা ওষুধ কিনে খেতে শুর্ব করেন। এছাড়াও অর্থলোভি কিছু চিকিৎসক ওষুধ প্রতিনিধি নির্ভর এবং রোগ নির্ণয় ছাড়াই রোগী অন্য চিকিৎসকের কাছে চলে যেতে পারে, এমন ধারণা থেকে অনুমানভিত্তিক রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন প্রকার ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন। ৭ দিনের একটি কোর্স দেয়া হলে দেখা যায় ৩ দিনে রোগীর উপসর্গ দূর হয়ে যায়। রোগী তখন ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। বেশীরভাগ ৰেত্রে রোগী কোর্স পূরণ করেন না। এটি মানুষের স্বাসে’্যর জন্য মারাত্মক ৰতিকর। বিশেষ করে গ্রাম্য চিকিৎসক নামে পরিচিতরা নিজেকে চিকিৎসক জাহির করতে রোগীকে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। অনেক ৰেত্রে রোগী ভালোও হয়ে যায়। মানুষ বা প্রাণীর ৰেত্রে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সংক্রমণগুলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক হয়ে ওঠে। যা পরবর্তীতে মানুষের সাধারণ রোগের জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে ওঠে।
সমপ্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি’ বিষয়ক দু’দিনব্যাপী এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক ও ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, আ্যন্টিবায়োটিক জীবিত ব্যাকটেরিয়া তথা অণুজীবের বিপরীতে কাজ করে। যে সকল রোগ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়, তা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ে আ্যন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন’ বর্তমানে মুরগি ও গর্বর ৰেত্রে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ মাংসজাতীয় খাদ্য বিষে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে অনুষ্ঠানে বক্তারা মানুষের স্বাস’্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়ে জোর দেন।
এদিকে, ডাবৱুএইচও-এর সূত্রে জানা যায়, খাদ্যজাতীয় রোগে বিশ্বে ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে ৫ বছরের কম শিশু মৃত্যুর সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ। ভাইরাস ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের ফলে সৃষ্ট দূষিত খাবার খেয়ে প্রতিবছর ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু মারা যায়।